ক্যানসারের আড়ালে থাকা ‘দেহরক্ষী’ প্রোটিন!
ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বার বার এক প্রশ্নই ফিরে আসে— এত চিকিৎসা, এত ওষুধ, তবু ক্যানসার কোষ বাঁচে কীভাবে? সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই রহস্যের পর্দা খানিকটা সরাল। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানবদেহের একটি বিশেষ প্রোটিনই ক্যানসার কোষের ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেই প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করতে পারলেই ক্যানসারের বাড়বাড়ন্ত অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব।
এই ‘খলনায়ক’-এর নাম টিএকে১ (TAK1)। সাধারণ অবস্থায় এই প্রোটিন আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কোষের জন্ম, বেড়ে ওঠা, ক্ষত সারানো— সবেতেই তার ভূমিকা আছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই প্রোটিনের গঠন বা আচরণে বদল আসে। তখনই সে নিজের চরিত্র পাল্টে ফেলে এবং সুস্থ দেহের শত্রু হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, টিএকে১ ক্যানসার কোষকে শুধু বাঁচতেই সাহায্য করে না, বরং ওষুধের হাত থেকেও আড়াল করে রাখে। ক্যানসার কোষের চারপাশে যেন একটি শক্ত বর্ম তৈরি করে দেয় সে। ফলে কেমোথেরাপি বা রেডিয়োথেরাপির মতো চিকিৎসা চলাকালীনও অনেক ক্যানসার কোষ টিকে যায়। শুধু তাই নয়, এই প্রোটিন ক্যানসার কোষের দ্রুত বিভাজনেও সাহায্য করে, যার ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে আরও তাড়াতাড়ি।
মানবদেহের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাও এই জায়গায় বাধার মুখে পড়ে। সাধারণত ক্যানসার কোষ জন্মালে শরীরের টি-কোষ নামের রোগপ্রতিরোধী সেনারা ছুটে গিয়ে আক্রমণ করে। কিন্তু টিএকে১ সেখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। টি-কোষের আক্রমণ ঠেকিয়ে ক্যানসার কোষকে রক্ষা করে সে। অর্থাৎ, শরীরের ভিতরেই ক্যানসারের এক বিশ্বস্ত দেহরক্ষী তৈরি হয়ে যায়।
এই কারণেই গবেষকদের লক্ষ্য এখন একটাই— টিএকে১-কে নিষ্ক্রিয় করা। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এবং অস্ট্রেলিয়ার অলিভিয়া নিউটন-জন ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই প্রোটিনকে বেঁধে ফেলতে পারলে ক্যানসারের বৃদ্ধি অনেকটাই ধীর করা যায়। তখন শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ওষুধ— দু’দিক থেকেই ক্যানসার কোষের উপর চাপ বাড়বে।
এই উদ্দেশ্যে গবেষকেরা ইমিউনোথেরাপির সাহায্যে নতুন ধরনের ওষুধ তৈরির কাজ শুরু করেছেন। পরীক্ষাগারে ইঁদুরের উপর সেই ওষুধে আশাব্যঞ্জক ফল মিলেছে। মানুষের শরীরে পরীক্ষা শুরু হলে তবেই নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে, ক্যানসার চিকিৎসায় এটি কতটা কার্যকর হবে।
তবু এতটুকু বলা যেতেই পারে— ক্যানসারের লুকিয়ে থাকা দেহরক্ষীকে চিহ্নিত করা গেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কবে তাকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হবে।