ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়ায় উপসাগর
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—উপসাগরীয় দেশগুলির জন্য বহু দশক ধরে যে মার্কিন ‘নিরাপত্তা ছাতা’ ছিল, সেটি কি আর আগের মতো কার্যকর রয়েছে? সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই বিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার বা বাহরিনে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ঘটনাই এই সংশয়কে আরও গভীর করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলাগুলি শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তেলের খনি, পরিশোধনাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করা হচ্ছে। ফলে উপসাগরীয় অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু—জ্বালানি শিল্প—নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছে।
আরব রাষ্ট্রগুলির ‘শাঁখের করাত’ অবস্থা
দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিদেশি শক্তির উপর নির্ভরশীল। এক সময় এই দায়িত্বে ছিল ব্রিটেন। পরে সেই জায়গা নেয় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেনা ঘাঁটি এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার বা বাহরিন নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তুলতে পেরেছে তেলের আয়ের উপর ভর করে।
কিন্তু বর্তমান সংঘাত পরিস্থিতি সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইরানের বক্তব্য স্পষ্ট—আরব অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই তারা কৌশলগতভাবে হামলা চালাচ্ছে।
ইতিহাসে ফিরে দেখা
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ইরান ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। তার আগে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল ‘টু পিলার্স’—অর্থাৎ সৌদি আরব ও ইরানকে ভরসা করে ভারসাম্য বজায় রাখা।
কিন্তু বিপ্লবের পর সেই সমীকরণ বদলে যায়। পরবর্তী দশকগুলিতে ইরান-ইরাক যুদ্ধ, কুয়েত দখল এবং ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’-এর মতো ঘটনাগুলি পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন উপস্থিতিকে আরও জোরালো করে তোলে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) গঠনের পরও ইরানের সঙ্গে বিরোধ থেকেই যায়।
নতুন বাস্তবতা: বিকল্প খুঁজবে আরব দুনিয়া?
বর্তমান সংঘাতের ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে—আরব দেশগুলি কি ভবিষ্যতে অন্য কোনও নিরাপত্তা জোটের দিকে ঝুঁকবে? বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, রাশিয়া বা চিনকে বিকল্প হিসেবে ভাবা হতে পারে।
এর পিছনে একটি বড় উদাহরণ হল ২০২৩ সালে চিনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে হওয়া শান্তি চুক্তি। সেই ঘটনার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় বেজিংয়ের কূটনৈতিক প্রভাব বেড়েছে।
তবে বাস্তবতা এত সহজ নয়। উপসাগরীয় দেশগুলির অর্থনীতি মূলত তেলের উপর নির্ভরশীল, আর আন্তর্জাতিক বাজারে সেই তেল বিক্রি হয় মার্কিন ডলারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সামনে কোন পথ?
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলির প্রধান লক্ষ্য হবে তাদের তেলক্ষেত্র ও জ্বালানি অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখা। একই সঙ্গে তারা কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করবে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা, অন্যদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর পথ খোঁজা।
ইরান, আমেরিকা এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে এই ক্ষমতার লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়াবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এতটা নিশ্চিত যে, পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে—আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?