ইরান-আমিরশাহির বরফ গলানো থেকে পাকিস্তানকে চাপ
দু’দিনের ব্রিক্স সম্মেলন শেষ। নয়াদিল্লির মাটিতে আয়োজিত এই বৈঠককে ঘিরে গত কয়েক দিনে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাশিয়া, চিন, ইরান-সহ একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে তাঁর আলাদা আলোচনা হয়েছে। ফলে সম্মেলন শেষে প্রশ্ন উঠছে—কূটনৈতিক দিক থেকে ভারত ঠিক কতটা লাভবান হল?
এ বারের সম্মেলনের সময়টা মোটেই সহজ ছিল না। পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আর তার পাশাপাশি আমেরিকার সঙ্গে একাধিক দেশের বাণিজ্য ও শুল্ক সংঘাত—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা তুঙ্গে। সেই পরিস্থিতিতে ব্রিক্সের মঞ্চে সদস্য দেশগুলিকে একসঙ্গে রাখা ভারতের কাছে বড় পরীক্ষা ছিল।
প্রথম সাফল্য—ইরান ও আমিরশাহির মধ্যে বরফ গলানো। ব্রিক্স সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের বৈঠক। গত কয়েক মাসের সংঘাতের আবহে দুই দেশের এই মুখোমুখি আলোচনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বৈঠকের পরে ইরানি দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, অতীতকে পিছনে ফেলে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে দুই পক্ষই সম্মত হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই সমঝোতার সম্ভাবনা ভারতের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থের পক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় সাফল্য—সর্বসম্মত ঘোষণাপত্র। ভূ-রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ব্রিক্সের সদস্য দেশগুলি নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে একমত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার, বাণিজ্য, ডিজিটাল পরিকাঠামো, কৃত্রিম মেধা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং উন্নত আর্থিক লেনদেনের মতো বিষয় সেখানে জায়গা পেয়েছে। ফলে শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভারতের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তৃতীয় বড় বিষয় পহেলগাঁও হামলা। ঘোষণাপত্রে ২০২৫ সালের পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার উল্লেখ রয়েছে। ২৬ জনের মৃত্যুর ওই হামলাকে ঘিরে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদতের অভিযোগ তুলে আসছে। এ বার ব্রিক্সের সর্বসম্মত নথিতে পহেলগাঁওয়ের উল্লেখ থাকাকে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সাফল্য হিসাবেই দেখছেন ভারতের একাংশের বিশেষজ্ঞ। যদিও ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের নাম সরাসরি নেই। ফলে বিষয়টিকে কতটা ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক জয়’ বলা যাবে, তা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে।
চতুর্থ সাফল্য—আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের পথে না গিয়ে বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামোর দাবি। ভারত ব্রিক্সকে কখনওই নিছক মার্কিন-বিরোধী মঞ্চ হিসাবে তুলে ধরেনি। বরং রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার এবং বিশ্ব ব্যাঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনকে বাদ দেওয়ার বদলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য আরও বিস্তৃত করার বার্তাই দিয়েছে নয়াদিল্লি।
পঞ্চম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—চিনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা। সাত বছর পর ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে এসেছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সীমান্ত সমস্যা মেটানো এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করার ইঙ্গিত তাঁর বক্তব্যে পাওয়া গিয়েছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকদের একাংশ। ভারত-চিন সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললে বাণিজ্য থেকে সীমান্ত—একাধিক ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ছবিটা পুরোপুরি একমুখী নয়। ব্রিক্সের এই সক্রিয় কূটনীতি আমেরিকা কী ভাবে দেখবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। আবার সীমান্তে ভারত-চিন সমস্যার বাস্তব সমাধান কতটা এগোয়, সেটিও দেখার। ফলে দিল্লির এই কূটনৈতিক সাফল্যগুলি শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী হয়, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনেই।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।