৩৮ বছরের পুরনো কৌশলেই হরমুজে চাপ তৈরি ইরানের!
সম্মুখযুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং কৌশল—এই পাঠই বিশ্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে ইরান। প্রায় ৩৮ বছর আগের এক ঘটনার প্রতিফলন যেন আবার দেখা গেল হরমুজ প্রণালী-কে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনায়।
১৯৮৭ সাল। ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন পারস্য উপসাগরে ঘটে যায় এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। রাতের অন্ধকারে ছোট নৌকা ব্যবহার করে সমুদ্রে পেতে রাখা হয় সামুদ্রিক মাইন—নীরব অথচ মারাত্মক অস্ত্র। পরদিনই তার প্রভাব পড়ে। মার্কিন পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ SS Bridgeton মাইনে আঘাত পেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ঘটনা শুধু একটি বিস্ফোরণ ছিল না, বরং কৌশলগত এক বড় বার্তা। অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন নৌবাহিনী সেই সময় মাইন শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, বিশাল ট্যাঙ্কারটিই উল্টে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলির ঢাল হয়ে ওঠে। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নৌশক্তির এই দুর্বলতা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তোলে।
এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল মার্কিন অভিযানে—Operation Earnest Will—যেখানে কুয়েতি তেল ট্যাঙ্কারগুলিকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নেয় আমেরিকা। কিন্তু সরাসরি আক্রমণ না করেও, শুধুমাত্র মাইন পেতে ইরান কার্যত সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশলের আসল শক্তি তার সরলতায়। কয়েক ডলারের একটি মাইন হাজার কোটি টাকার জাহাজকে থামিয়ে দিতে পারে। আর ছোট নৌকার গোপন অভিযানে তা পেতে রাখা গেলে, শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে একই কৌশলের আধুনিক রূপ দেখা গেছে হরমুজ প্রণালীতে। অভিযোগ, ইরান উন্নত প্রযুক্তির “মাহম” সিরিজের মাইন ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চাপ সৃষ্টি করেছে। এই মাইনগুলি শুধু চৌম্বকত্ব নয়, জাহাজের শব্দ, কম্পন এমনকি জলের চাপের পরিবর্তনও বুঝতে পারে—ফলে এগুলি এড়ানো আরও কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জে পড়েছে আধুনিক নৌপ্রযুক্তিও। আমেরিকা এখন দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন ও হেলিকপ্টার দিয়ে মাইন সাফ করার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে থাকা এই উন্নত মাইন শনাক্ত করা এখনও অত্যন্ত কঠিন।
এখানেই উঠে আসে ব্রিটিশ প্রযুক্তির প্রসঙ্গ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উদ্ভাবিত “ডিগসিং” পদ্ধতি—যার মাধ্যমে জাহাজের চৌম্বকীয় উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়া হয়—আজও কার্যকর বলে মনে করা হয়। Royal Navy এই প্রযুক্তিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ।
তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাইন প্রযুক্তিও উন্নত হয়েছে। ফলে পুরনো কৌশল কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ব্রিটেন এখন রোবোটিক সাবমেরিন, লেজার স্ক্যানিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নতুন সমাধান খুঁজছে।
সব মিলিয়ে, ৩৮ বছর আগের সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক—যুদ্ধে শুধু শক্তি নয়, বুদ্ধি ও কৌশলই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় ফলাফল। আর হরমুজ প্রণালীর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে।
শেষ লড়াইয়ের গল্প: জল থেকে তোলার পরও বেঁচে ছিলেন রাহুল, তবু বাঁচানো গেল না