‘কন্দহরের ভূত’ থেকে যুদ্ধের নতুন যুগ!
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর গোটা বিশ্বে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কৌশলে বড় পরিবর্তন আসে। সেই সময় থেকেই উন্নত প্রযুক্তির নজরদারি ব্যবস্থার দিকে জোর দেয় আমেরিকা। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক ছিল এক বিশেষ ড্রোন—RQ-170 Sentinel।
এই ড্রোনটি তৈরি করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা Lockheed Martin। অত্যাধুনিক স্টেল্থ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই মানববিহীন বিমানটি পরিচালনা করত United States Air Force, আর এর নজরদারি অভিযানের বড় অংশ পরিচালনা করত Central Intelligence Agency।
নিঃশব্দ নজরদারির ‘প্রেতাত্মা’
সামরিক মহলে এই ড্রোনকে প্রায়ই “Wraith” বা “প্রেতাত্মা” বলা হয়। কারণ, এটি এতটাই নিঃশব্দ ও রাডারে ধরা পড়া কঠিন যে শত্রুপক্ষের আকাশসীমায় ঢুকে নজরদারি চালিয়ে ফিরে আসতে পারে প্রায় অদৃশ্যভাবেই।
২০০৭ সালে চালু হওয়ার পর খুব দ্রুতই এই ড্রোন মোতায়েন করা হয় আফগানিস্তানে। দক্ষিণ আফগানিস্তানের কন্দহর বিমানঘাঁটি থেকেই বহু গোপন নজরদারি অভিযান চালানো হয়েছিল। সেখান থেকেই এর আরেক নাম হয়ে যায়—“Beast of Kandahar” বা ‘কন্দহরের ভয়ঙ্কর পশু’।
এই ড্রোনের নকশাও বিশেষ। এর ডানার আকৃতি অনেকটা স্টেল্থ বোমারু বিমানের মতো, যা রাডারের সংকেত শোষণ করতে পারে। পাশাপাশি এতে থাকে উন্নত সেন্সর, যা দূর থেকে ছবি তোলা এবং যোগাযোগ সংকেত পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।
ইরানের হাতে ধরা পড়া ড্রোন
২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে ঘিরেই তৈরি হয় আন্তর্জাতিক বিতর্ক। ইরান দাবি করে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি মার্কিন ড্রোন তারা আটক করেছে।
তেহরানের দাবি অনুযায়ী, আফগান সীমান্ত থেকে প্রায় ২২৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর-পূর্ব ইরানের কাশমার অঞ্চলের কাছে ড্রোনটি নেমে আসে। পরে তারা জানায়, সেটি ছিল আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল।
অন্য দিকে, ওয়াশিংটন স্বীকার করলেও যে তাদের একটি ড্রোন হারিয়ে গিয়েছে, কী ভাবে সেটি ইরানের ভেতরে পৌঁছল তা নিয়ে মতভেদ দেখা যায়।
ইরানের দাবি ছিল, তারা ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রোনটির নেভিগেশন সিস্টেমে হস্তক্ষেপ করেছিল এবং সেটিকে কার্যত ‘হাইজ্যাক’ করেছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই ড্রোনটি পথ হারিয়েছিল।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই ঘটনা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি একটি স্টেল্থ ড্রোন অক্ষত অবস্থায় শত্রুপক্ষের হাতে পড়ে, তা হলে সেই দেশের প্রযুক্তিবিদরা সেটির গঠন ও প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করতে পারেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং”।
এর ফলে স্টেল্থ প্রযুক্তি কী ভাবে কাজ করে, তা বোঝা সম্ভব হয়। এমনকি ভবিষ্যতে সেই প্রযুক্তির মোকাবিলা করার উপায়ও তৈরি করা যায়।
এই আশঙ্কা থেকেই মার্কিন প্রশাসন তখন ড্রোনটি ফেরত চেয়েছিল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Barack Obama প্রকাশ্যেই ইরানের কাছে বিমানটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ইরান সেই অনুরোধ মানেনি।
আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাই বিশ্বজুড়ে ড্রোন প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্রতিযোগিতাকে নতুন দিক দেখায়। অনেক দেশ বুঝতে পারে—শুধু অস্ত্রের শক্তি নয়, প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমত্তাও এখন যুদ্ধের বড় অস্ত্র।
আজকের দিনে নজরদারি, গোয়েন্দা অভিযান এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী হামলার ক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। আর সেই পরিবর্তনের ইতিহাসে আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেলের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবেই বিবেচিত হয়।
একটি নিঃশব্দ ড্রোনের অপ্রত্যাশিত অবতরণ তাই শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়—এটি আধুনিক যুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের সূচনাও।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?