ট্রাম্পের নতুন প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি, ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এর আগে, তিনি বলেছিলেন, “আমরা একটি নতুন কূটনৈতিক যুগের দিকে এগোচ্ছি। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চেহারা বদলে যেতে পারে।” এই পরিপ্রেক্ষিতে, জয়শঙ্কর যে চারটি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করবেন, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বেশ কিছু কথা হচ্ছে।
২০১৭ সালে, যখন ট্রাম্প প্রথমবার শপথ নিয়েছিলেন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘হাওডি মোদী’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং ট্রাম্প সরকারের প্রতি তাঁর সমালোচনা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন, পরিস্থিতি অনেকটাই পরিবর্তিত। ভারত এবং আমেরিকার সম্পর্ক এখন আরও গভীর এবং চ্যালেঞ্জও অনেক। ভারত কীভাবে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, সেই বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চার-দফা আলোচনা: বাণিজ্য, অভিবাসন, চীন এবং জলবায়ু চ্যালেঞ্জ
ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, জয়শঙ্কর ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি চার-দফা আলোচনা সূচি নিয়ে পৌঁছেছেন। এই আলোচনা গুলির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষভাবে, ভারতের স্বার্থে মার্কিন প্রশাসনের পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে।
প্রথম চ্যালেঞ্জটি হল বাণিজ্য। ২০১৭ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত আমেরিকা এবং ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দৃশ্যপট অনেক বদলেছে। ট্রাম্প, নির্বাচনের আগে ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতি নিয়ে কথা বলেছিলেন এবং আমেরিকার পণ্যগুলির উপর শুল্ক আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর, তিনি আরও ঘোষণা করেছেন যে আমেরিকার বাণিজ্য ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হবে। এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় বাজারে, যেখানে কিছু মার্কিন পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক ধার্য রয়েছে। জয়শঙ্করের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে, এই শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির সঙ্গে ভারতের স্বার্থ কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, তা নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয় বিষয়টি অভিবাসন। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তিনি কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়ন করবেন এবং অবৈধ অভিবাসীদের ফিরিয়ে পাঠাবেন। এই পদক্ষেপের ফলস্বরূপ, ১৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং প্রথম দফায় ১৮ হাজার ভারতীয় নাগরিকও এর মধ্যে রয়েছেন। জয়শঙ্কর এই সমস্যার সমাধানে কি ব্যবস্থা নিতে পারেন, তা আলোচনার অন্যতম অঙ্গ।
চীন এবং জলবায়ু পরিবর্তন: ভারতের উদ্বেগ
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হল চীন। ট্রাম্প প্রশাসন, নির্বাচনের আগে চীনকে নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। তবে, নির্বাচনের পরবর্তীকালে, ট্রাম্পের কিছু ইঙ্গিত দেখিয়েছে যে, তিনি চীনকে নিয়ে আরও নমনীয় মনোভাব পোষণ করতে পারেন। ভারতের পক্ষ থেকে, এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়, কারণ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার উপর নির্ভর করে। জয়শঙ্কর এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ভারতের কৌশলগত এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।
চতুর্থ এবং শেষ চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। ট্রাম্পের আগের প্রশাসন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং এর ফলে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সমস্যা তৈরি হয়েছিল। ভারত, উন্নত দেশগুলোর কাছে পরিবেশ দূষণ রোধে আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়েছে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তির প্রতি কতটা গুরুত্ব দেবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষভাবে, তিনি যদি পরিবেশবিষয়ক নীতিতে পুনরায় ফিরে যান, তা ভারতের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন দিগন্ত: জয়শঙ্করের কূটনৈতিক কৌশল
এই চারটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে, জয়শঙ্কর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চান। মূল লক্ষ্য থাকবে, ভারত ও আমেরিকার মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করা, সঠিকভাবে বাণিজ্য এবং অভিবাসন নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, এবং চীন এবং পরিবেশগত সমস্যাগুলির মোকাবিলা। এই আলোচনাগুলির মধ্যে, ভারতের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে জয়শঙ্করের কূটনৈতিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।