ইরান-মোসাদ দ্বন্দ্ব
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি রক্তাক্ত ও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইরান ও ইজরায়েলের চলমান দ্বন্দ্বে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা, যেখানে ইরান এবার পাকিস্তানি নাগরিকদের ব্যবহার করে ইহুদি ও মার্কিনিদের ওপর হামলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে জানা গেছে। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় এই সংঘাত আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ও হামলার পরিকল্পনা ইজরায়েলি ও মার্কিন গোয়েন্দাদের মধ্যে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের নতুন কৌশল: পাক নাগরিকদের ব্যবহার
মার্কিন গোয়েন্দাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরান এবার পাকিস্তানের বাসিন্দাদের ব্যবহার করে ইহুদি ও মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গ্রিসের রাজধানী আথেন্সে একটি ইহুদি রেস্তরাঁয় হামলার চেষ্টায় জড়িত ছিল দুই পাকিস্তানি নাগরিক। ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সহযোগিতায় গ্রিস পুলিশ সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয় এবং দুই পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনার পর পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-পাকিস্তান যোগসূত্র নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
হামলার পরিকল্পনা: টাকার লোভে ফাঁদে পাক নাগরিক
তদন্তে জানা যায়, গ্রিসে গ্রেপ্তারকৃত সৈয়দ ইরতেজা হায়দার ও সৈয়দ ফকর আব্বাসের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। ফকর আব্বাস ইরানে বসেই ওই হামলার পরিকল্পনা করে। প্রথমে বিষাক্ত গ্যাস ও পরে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করা হয়, যা শেষমেশ বাতিল করে একে-৪৭ হাতে রেস্তরাঁয় ঢুকে মুম্বই হামলার ধাঁচে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পরিকল্পনার জন্য ইরতেজাকে ৫০ হাজার ইউরোর প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। টাকার লোভে ফাঁদে পা দিয়ে তিনি পরিকল্পনায় যোগ দেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যান।
ইরানের লক্ষ্যবস্তু: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও গোয়েন্দা সংস্থা
মার্কিন গোয়েন্দাদের অভিযোগ, ইরানের পরিকল্পনার তালিকায় আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সহ সিআইএ-এর বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ইরান এই গুপ্তহত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে পাক নাগরিকদের সহযোগিতা নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটনের মতে, ২০২০ সাল থেকে ইরান অন্তত ৩৩টি বড় আক্রমণের পরিকল্পনা করে, যার কিছু ক্ষেত্রে তারা সফল হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যর্থ হয়।
সম্প্রতি ইরান বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক রেজা ভ্যালিজাদের রহস্যজনক গায়েব হওয়াও ইরানের গুপ্তচরবৃত্তি কার্যক্রমের অংশ বলে মনে করছেন মার্কিন গোয়েন্দারা। পরিবারকে আটক করার খবর পেয়ে তিনি ইরানে যান, আর এরপরই তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাকে আটকে রেখে অত্যাচার করছে।
ইরানের দাবি: পাল্টা অভিযোগ মোসাদের বিরুদ্ধে
মার্কিন ও ইজরায়েলি অভিযোগের পাল্টা জবাবে ইরান দাবি করছে, ইহুদিরাই একের পর এক ইরানি বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করে চলেছে। ২০২০ সালে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ও পরমাণু গবেষক মোহসিন ফকরিজাদা এবং একই বছরের জানুয়ারিতে কুর্দ ফোর্সের কম্যান্ডার কাসেম সুলেমানির হত্যাকাণ্ডের জন্যও ইরান মোসাদ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে। ইরানের দাবি, তাদের জনপ্রিয় সামরিক কর্মকর্তাকে খতম করার পরিকল্পনায় সহযোগিতা করে মোসাদ, যার ভিত্তিতে ড্রোন হামলা চালায় ওয়াশিংটন।
ইরানের মিত্র জঙ্গি সংগঠনগুলো এবং ভবিষ্যতের উদ্বেগ
বর্তমানে ইরান ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে না গেলেও, হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথি মিলিয়ে মোট তিনটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে লড়াইয়ে মদত দিচ্ছে। এসব সন্ত্রাসী সংগঠন ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যদি পাকিস্তানের জঙ্গিরা এই দলে যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কড়াকড়ি করার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমে তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির আশঙ্কা জাগিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি হলে, জঙ্গি কার্যকলাপে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারে ইরান-পাকিস্তান যোগসূত্র।
তেহরানের বর্তমান পরিকল্পনাগুলো মার্কিন ও ইজরায়েলি গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি আসন্ন সময়ে কীভাবে মোড় নেয়, তা নিয়ে সারা বিশ্ব এখন চিন্তিত।