ভোটার তালিকা বিতর্কে তৃণমূল-বিজেপির!
পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষিতে ভোটার তালিকা সংশোধনের দাবি নিয়ে একই দিনে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হলো রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করল দুই পক্ষ। তবে বৈঠকের পর তাঁদের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার কমিশনের প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট, অন্যদিকে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তুললেন যে, তাঁদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে কমিশন।
ভোটার তালিকা নিয়ে BJP-র অভিযোগ ও কমিশনের প্রতিক্রিয়া
গত শুক্রবারই সুকান্ত মজুমদার ঘোষণা করেছিলেন যে, ১১ মার্চ বিজেপির প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করবে। যদিও এই সিদ্ধান্ত তারও আগে নেওয়া হয়েছিল, অমিত শাহ, অমিত মালব্য এবং সুকান্তের বৈঠকের দিনেই। প্রথমে বিজেপি চার জনের প্রতিনিধি দল পাঠানোর কথা বললেও, শেষ মুহূর্তে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ জনে।
বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে সুকান্ত জানান, “তৃণমূল বাংলার ভোটার তালিকায় বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের নাম ঢুকিয়েছে। মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়নি, একই ভোটারের নাম একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে রয়েছে। এই সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণসহ আমরা অভিযোগ জানিয়েছি।”
সুকান্ত আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ভুয়ো ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে যা যা করা প্রয়োজন, কমিশন তা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।”
বিজেপির দাবি অনুযায়ী, ১৭ লক্ষের বেশি ভুয়ো ভোটার বাংলার তালিকায় রয়েছে। তবে বিজেপির দাবির পর কমিশন ইতোমধ্যেই চার লক্ষ ভুয়ো ভোটার চিহ্নিত করে বাদ দিয়েছে, এবং বাকি ১৩ লক্ষ ভুয়ো ভোটারও বাদ দেওয়া হবে বলে কমিশন আশ্বাস দিয়েছে।
তৃণমূলের পাল্টা অভিযোগ ও ক্ষোভ
বৈঠকের পর তৃণমূলের লোকসভার মুখ্য সচেতক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁর অভিযোগ, “একই এপিক নম্বরে বিভিন্ন রাজ্যে কীভাবে ভোটারের নাম থাকতে পারে? এটি সরাসরি নির্বাচন বিধির ২৮ নম্বর নিয়ম লঙ্ঘন করছে।”
কল্যাণ আরও বলেন, “কমিশন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নজরদারি চালায়, সাত-আট দফায় নির্বাচন করে। তাহলে রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও একই ধরনের অনিয়ম কীভাবে ঘটছে?”
তিনি বিজেপির প্রতিনিধি দলের আগে কমিশনে যাওয়ার বিষয়টিকেও কটাক্ষ করে বলেন, “দিল্লিতে বিজেপির একটা বড় ঘর রয়েছে—এক দিকে বিজেপি, এক দিকে নির্বাচন কমিশন, এক দিকে সিবিআই, এক দিকে ইডি। বিজেপি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়েছিল মাত্র। আমরা এসেছি বলেই ওরাও এসেছে।”
তবে সুকান্ত এই মন্তব্যের কড়া জবাব দেন, “আমরা তৃণমূলকে অনুসরণ করে আসিনি। বরং কারা আগে নির্বাচন কমিশনের কাছে সময় চেয়ে আবেদন করেছিল, সেটি খোঁজ নিলেই কল্যাণবাবু বুঝতে পারবেন।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ ও কমিশনের বিবৃতি
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য থেকে। ২৭ ফেব্রুয়ারি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের সভায় তিনি প্রথম ‘ভূতুড়ে’ ভোটারদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন এবং একই এপিক নম্বরে একাধিক ব্যক্তির নাম থাকার অভিযোগ তোলেন।
তৃণমূলের স্মারকলিপিতেও এই অভিযোগের প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে লেখা হয়, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি না তোলার আগে পর্যন্ত কেন বছরের পর বছর এই অনিয়ম চলছিল?”
এদিকে, নির্বাচন কমিশন মঙ্গলবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায় যে, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করতে সব রাজনৈতিক দলের পরামর্শ স্বাগত।
কমিশন আরও জানায়, জাতীয় ও রাজ্য দলের সভাপতি এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যাতে তাঁরা প্রচলিত আইন ও বিধির সীমার মধ্যে থেকে তাঁদের পরামর্শ পাঠান। এই পরামর্শ কমিশনকে আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে জানাতে হবে।
শেষ কথা
ভোটার তালিকা সংশোধনের দাবি নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির লড়াই যে এবার আরও তীব্র হবে, তা এই বৈঠকের পর স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশনের আশ্বাসে বিজেপি আপাতত সন্তুষ্ট থাকলেও, তৃণমূল তাদের দাবিতে অনড়। আগামী দিনে এই বিতর্ক কী মোড় নেয়, তা দেখার বিষয়।
ভারতের বদলার জয়: ২৫ বছর পর নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি রোহিতদের হাতে