ভূগর্ভস্থ ‘অস্ত্র নগরী’ দেখিয়ে আমেরিকাকে চমকাল ইরান!
মাটির গভীরে আস্ত একটা শহর! শহর জুড়ে বিশাল সুড়ঙ্গপথ, আর সেই পথের দু’পাশে সারি সারি ক্ষেপণাস্ত্র। সম্প্রতি ইরান এমনই একটি ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ প্রকাশ্যে এনে বিশ্বকে হতবাক করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) প্রকাশিত এই ভিডিওকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের প্রতি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
পারমাণবিক চুক্তির টানাপোড়েন ও ইরানের হুঁশিয়ারি
মার্চ মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু চুক্তিতে সই করতে কড়া সতর্কবার্তা দেন। মাত্র দুই মাসের মধ্যে ইরানকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে, নাহলে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়া হয়।
কিন্তু তেহরান এই চুক্তি সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির প্রেক্ষিতেই ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ প্রকাশ্যে এনে শক্তি প্রদর্শন করেছে। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনাকে আরও উস্কে দিয়েছে।
‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ কী?
২০২০ সালে প্রথমবারের মতো ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ছবি প্রকাশ করে। এরপর ২০২৩ সালে তারা দ্বিতীয় ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ প্রকাশ্যে আনে। এবার ২০২৫ সালে তৃতীয় ক্ষেপণাস্ত্র নগরীর ভিডিও সামনে আনল তেহরান।
এই শহরে আধুনিক সব ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- খেইবার-শেকান
- গাদর-এইচ
- সেজিল
- পাভেহ ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র
এই অস্ত্রগুলোর মাধ্যমে ইজরায়েলকে টার্গেট করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে ইরান, এমনটাই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
ইরানের ভিডিও প্রকাশের তাৎপর্য
এই ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে ইরান দুটি প্রধান বার্তা দিতে চেয়েছে—
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেওয়া।
- তাদের সামরিক শক্তি কতটা উন্নত হয়েছে, তা বিশ্বকে দেখানো।
ভিডিওতে দেখা যায়, IRGC-এর শীর্ষ দুই কর্মকর্তা—মেজর জেনারেল মহম্মদ হুসেন বাঘেরি ও এরোস্পেস ফোর্সের প্রধান আমির আলি হাজিজাদেহ একটি খোলা জিপে বসে এই অস্ত্রশালা পরিদর্শন করছেন।
পারস্য উপসাগরে নতুন সামরিক উত্তেজনা
শুধু ভিডিও প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয়নি ইরান। তারা পারস্য উপসাগরে IRGC নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে, যেখানে ইরানের রণতরীগুলিতে প্যালেস্টাইনের পতাকা উড়তে দেখা গেছে। বিশাল আকারের ড্রোন বাহিনীও সেখানে মহড়া চালাচ্ছে, যা ইরানের সামরিক শক্তির বহরকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে।
অন্যদিকে, আমেরিকাও প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন সেনারা ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে তাদের নৌ ও বিমান বাহিনীর ঘাঁটি আরও শক্তিশালী করছে। সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে ‘বি-২ স্পিরিট’ স্টেলথ বোমারু বিমান ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র।
বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ভিডিও প্রকাশ আসলে ইরানের এক কৌশলী পদক্ষেপ। তবে অনেকেই মনে করছেন, এটি ইরানের একটি বড় ভুলও হতে পারে। কারণ, তারা তাদের অস্ত্রাগার ও সামরিক ঘাঁটির অবস্থান প্রকাশ করে ফেলেছে।
মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ (CIA) যদি একবার এই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির সঠিক অবস্থান খুঁজে বের করতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এটি ধ্বংস করা কোনো কঠিন কাজ হবে না।
এছাড়া, ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’-এ অত্যন্ত কাছাকাছি বিপজ্জনক অস্ত্র মজুত রাখা হয়েছে, যা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কি আসন্ন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এই পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যদি ইরানের উপর সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এই সংঘর্ষ শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও যুক্ত হবে।
এর পাশাপাশি, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিশোধ নিতে চায়, তাহলে ভারত মহাসাগরের মার্কিন ঘাঁটিগুলিও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
উপসংহার
ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ প্রকাশ করা নিছকই শক্তি প্রদর্শনের কৌশল নাকি যুদ্ধের ইঙ্গিত, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটি নিশ্চিত যে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধু এই দুই দেশ নয়, গোটা বিশ্ব তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া অনুভব করবে।
বিজেপি-এডিএমকে জোট নিয়ে নতুন জল্পনা: শর্তই কি আলোচনার মূল বিষয়?