কলকাতার স্কুল-কলেজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট!
এক সময় পড়াশোনার মানে ছিল বই খুলে বসা, নিজের হাতে খাতা-কলমে লেখা আর টিচারদের বোঝানো পাঠ। কিন্তু এখন শিক্ষার ছবিটাই বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে কলকাতার স্কুল-কলেজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর ঢুকে পড়া নতুন করে ভাবাচ্ছে অভিভাবক, শিক্ষক আর শিক্ষাবিদদের। প্রযুক্তির হাত ধরে জ্ঞান যেন হাতের মুঠোয়, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই সহজলভ্যতা কি আদতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করছে?
পড়াশোনার শর্টকাটে বাড়ছে নির্ভরতা
বর্তমানে গুগল বা চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-এর মতো এআই টুলে প্রশ্ন করলেই সেকেন্ডের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে প্রজেক্ট, রচনার উত্তর, এমনকি অঙ্কের সমাধানও। এটা যেমন সময় বাঁচাচ্ছে, তেমনই পড়ুয়ারা মূল বিষয় না বুঝেই ‘কপি-পেস্ট’ করে জমা দিচ্ছে অ্যাসাইনমেন্ট। অনেক শিক্ষকের মতে, এতে পড়ুয়াদের চিন্তাভাবনার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
কলকাতার এক বেসরকারি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপিকা জানালেন, “বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী এখন এআই দিয়ে লেখা রচনা জমা দিচ্ছে। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি, কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম ভাষার গঠন অস্বাভাবিক এবং তাদের মৌখিক পরীক্ষায় সেই বিষয় বোঝার কোনও ছাপই নেই।”
শিখছে তো, না কি ফাঁকি দিচ্ছে?
এআই প্রযুক্তি যেমন শিক্ষায় গতি এনেছে, তেমনি অনেকে এটাকে অলসতার অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখন সহজ রাস্তা বেছে নিচ্ছে। পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়া বা নিজে রচনা লিখে চিন্তা করার জায়গায় এখন শুধু একটি বাটনে ভরসা রাখছে তারা।
একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের কথায়, “স্কুলে যখন প্রজেক্ট জমা দিতে বলা হয়, তখন সময় বাঁচাতে আমি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করি। খুব কাজের জিনিস। তবে সব সময় না বুঝে লিখে ফেললে টিচার ধরেও ফেলেন।”
শিক্ষক ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা
অভিভাবকদের মতে, সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা অসম্ভব। তবে প্রযুক্তি যেন তাদের মানসিক বিকাশে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। অনেকেই বলছেন, স্কুল-কলেজগুলোতে এখনই যদি সঠিক গাইডলাইন না আনা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু মুখস্থ বিদ্যা বা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়বে।
একটি বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা জানাচ্ছেন, “আমরা এখন স্কুলে নিয়ম চালু করেছি—ছাত্রছাত্রীদের রচনার খসড়া আগে হাতে লিখে জমা দিতে হবে। এর ফলে অন্তত বোঝা যায়, তারা নিজের মতো চিন্তা করছে কি না।”
প্রযুক্তির সঙ্গে সহাবস্থানই ভবিষ্যৎ
এআইকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। বরং ছাত্রদের শেখানো দরকার—কীভাবে প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, ফাঁকির রাস্তা হিসেবে নয়। অনেক শিক্ষাবিদই এখন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শেখাতে চাচ্ছেন, যাতে ছাত্রছাত্রীরা চিন্তা করতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, কেবল উত্তর খুঁজে পাওয়ার উপর নির্ভর না করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি আমাদের শিক্ষাপদ্ধতির পরিপূরক হয়, তাহলে তা আশীর্বাদ। কিন্তু যদি সেটাই হয়ে ওঠে শিক্ষার আসল চালক, তাহলে ক্ষতি অনিবার্য। তাই এখনই সময়, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে ছাত্রদের গড়ে তোলার—যাতে তারা হয় প্রযুক্তিসচেতন, কিন্তু চিন্তাশক্তি হারায় না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালোবাসার ছবি, খোলাখুলি রোম্যান্সে মশগুল সোনাক্ষী-জহির