কলকাতার পাশেই কি নতুন ‘জামতাড়া’?
সল্টলেকের সেক্টর ফাইভ এক সময় ছিল তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র। কিন্তু বেআইনি কলসেন্টারকে ঘিরে গত কয়েক বছরে এই এলাকা সাইবার প্রতারণার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। এ বার রাজ্য পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—বিধাননগর এলাকা থেকে কেনা শত শত সিম কার্ড এবং রাজ্যের প্রায় ১.৭২ লক্ষ ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার সম্ভাব্য চক্র।
কলকাতা লাগোয়া বিধাননগর কি দেশের নতুন ‘জামতাড়া’ হয়ে উঠছে? রাজ্য পুলিশের হাতে আসা কিছু তথ্য সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। গোয়েন্দাদের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত রাজ্যে সাইবার প্রতারণার অঙ্ক ৬৭৫ কোটি টাকারও বেশি। সেই অর্থ প্রথমে পৌঁছেছে রাজ্যের প্রায় ১ লক্ষ ৭২ হাজার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
তদন্তকারীদের ভাষায়, এগুলি ‘ফার্স্ট লেয়ার মিউল অ্যাকাউন্ট’। অর্থাৎ, প্রতারিত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা প্রথম যে অ্যাকাউন্টে যায়, সেটিই এই স্তরের অ্যাকাউন্ট। গোয়েন্দাদের দাবি, এই বিপুল সংখ্যক অ্যাকাউন্টের অনেকগুলিই ভাড়া নিয়ে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিধাননগর থেকে কেনা ৪১৪ সিম
তদন্তে আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে। প্রতারণায় ব্যবহৃত ৪১৪টি সিম কার্ড বিধাননগর এলাকা থেকে কেনা হয়েছিল বলে পুলিশের হাতে তথ্য এসেছে। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, এক বা একাধিক সংগঠিত সাইবার অপরাধচক্র এই সিম এবং ভাড়ার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় একটি এফআইআরও দায়ের হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের অনুমান, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের নামে মোটা লাভের প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর মতো প্রতারণার পিছনে এই ধরনের সংগঠিত চক্র কাজ করতে পারে।
সল্টলেকের পুরনো বদনাম, এ বার নতুন আশঙ্কা
সল্টলেকের সেক্টর ফাইভ গত কয়েক বছরে বেআইনি কলসেন্টারকেন্দ্রিক সাইবার প্রতারণার জন্য আন্তর্জাতিক তদন্তকারীদের নজরে এসেছে। জার্মানি, ব্রিটেন, আমেরিকার মতো দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে একাধিক প্রতারণার অভিযোগও রাজ্য পুলিশের কাছে পৌঁছেছে।
তবে বর্তমান তদন্তের বিষয়টি কিছুটা আলাদা। এ ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন দেশেরই বাসিন্দারা এবং ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই টাকা সরানোর অভিযোগ উঠছে।
পুলিশের একাংশের দাবি, প্রথম স্তরের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছনোর পর দ্রুত তা ছোট ছোট অঙ্কে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেই টাকা কোনও কোনও ক্ষেত্রে চিনা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত সংস্থায় পৌঁছতে পারে বলেও তদন্তকারীদের সন্দেহ। তবে এই যোগের বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন।
চিনা সাইবার মাফিয়ার যোগ?
সাইবার প্রতারণার অর্থ চিনা অপরাধচক্রের কাছে পৌঁছনোর একাধিক নজির তদন্তকারীদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি প্রতারণার টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বদলে পাচারের ঘটনাও সামনে এসেছে।
তবে বিধাননগরের ১.৭২ লক্ষ অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সরাসরি চিনা মাফিয়ার যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও প্রমাণিত নয়। অপরাধের ধরন এবং অর্থের গতিপথ খতিয়ে দেখেই গোয়েন্দারা সেই সম্ভাবনা যাচাই করছেন।
জামতাড়ার মতোই কি তৈরি হচ্ছে নতুন কেন্দ্র?
ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া দীর্ঘ দিন ধরেই ভারতে সাইবার প্রতারণার অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র। ভুয়ো ব্যাঙ্ক আধিকারিক সেজে কেওয়াইসি আপডেটের নাম করে তথ্য হাতানো, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখানো, পুরস্কারের টোপ দেওয়া কিংবা ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর নামে আতঙ্ক তৈরি—বিভিন্ন কৌশলে প্রতারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে সেখানে।
পুলিশি অভিযান এবং গ্রেফতারি সত্ত্বেও সেই চক্র পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। এ বার বিধাননগরকে ঘিরে উঠে আসা ৪১৪টি সিম এবং ৬৭৫ কোটি টাকার প্রতারণার তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে বিধাননগরকে এখনই ‘নতুন জামতাড়া’ বলা যাবে কি না, তার উত্তর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। আপাতত পুলিশের নজর মিউল অ্যাকাউন্ট, সিম কার্ডের উৎস, টাকার গতিপথ এবং সম্ভাব্য সংগঠিত চক্রের দিকে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।