পাপাই থেকে ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’!
একসময় বাগুইআটি-জ্যাংড়া এলাকার মানুষ তাঁকে চিনতেন ‘পাপাই’ নামে। শান্ত, ভদ্র এবং মিষ্টভাষী এক যুবক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন দেবরাজ চক্রবর্তী। কিন্তু গত এক দশকে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান যেমন ছিল চোখে পড়ার মতো দ্রুত, তেমনই সেই উত্থানের সঙ্গেই জুড়েছে তোলাবাজি, বেআইনি সম্পত্তি এবং আর্থিক দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ। এখন সেই সব অভিযোগের তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে বিধাননগর পুলিশ।
তদন্তকারীদের দাবি, দেবরাজের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধে মদত, তোলাবাজি এবং অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পত্তি তৈরির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক বছরে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী রাজারহাট, নিউ টাউন থেকে শুরু করে ভিন্রাজ্যেও একের পর এক সম্পত্তি কিনেছেন। পাশাপাশি তাঁর সংস্থা ‘ডিসি গ্লোবাল’-এর আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় এসেছে। অর্থপাচারের সম্ভাব্য যোগ খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। পুলিশের পাশাপাশি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-ও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সূত্রের দাবি।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল তৎকালীন তৃণমূল নেত্রী দোলা সেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে। পরে প্রাক্তন মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর আপ্তসহায়ক হন তিনি। এলাকার প্রবীণ তৃণমূল কর্মীদের দাবি, সেই পরিচয় কাজে লাগিয়েই দ্রুত নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে শুরু করেন দেবরাজ। কাউন্সিলরের টিকিট না পেয়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে নির্বাচনে জেতেন। পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন। সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক উত্থান আরও দ্রুত হয়।
দলের একাংশের অভিযোগ, ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছনোর পর থেকেই এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়ীদের উপর চাপ সৃষ্টি এবং সংগঠন নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা বাড়তে থাকে। পরবর্তীকালে রিয়্যালিটি শো-খ্যাত গায়িকা অদিতি মুন্সিকে বিয়ে এবং সেই বিয়ের জাঁকজমক নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। কয়েক বছরের মধ্যে এত বিপুল সম্পদের উৎস নিয়েও জল্পনা শুরু হয়।
২০২১ সালে অদিতি মুন্সি বিধায়ক হওয়ার পর দেবরাজের প্রভাব আরও বাড়ে বলে অভিযোগ। তবে একই সময়ে তাঁর নাম জড়ায় নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা এবং শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তেও। যদিও প্রতিটি অভিযোগই বরাবর অস্বীকার করেছেন তিনি।
সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বাগুইআটি থানায় একের পর এক তোলাবাজির অভিযোগ জমা পড়তে থাকে। গ্রেফতার হন তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ। এরপর দীর্ঘদিন কার্যত গা-ঢাকা দেন দেবরাজ। তদন্তকারীদের দাবি, উত্তরবঙ্গ থেকে ঝাড়খণ্ড— একাধিক জায়গায় ডেরা বদলে লুকিয়ে ছিলেন তিনি। মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের সহায়তায় আত্মগোপন করেছিলেন বলেও অভিযোগ।
শেষ পর্যন্ত পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের একটি নির্মীয়মাণ রিসর্ট থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মোবাইল, ল্যাপটপ-সহ একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। সেই কারণে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে তথ্য উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, অভিযোগ অনুযায়ী তোলাবাজির অর্থ কোথায় গিয়েছে, কারা সেই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এই বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মহলেও প্রশ্ন উঠছে— দেবরাজের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আগে কেন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি? এই প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?