২৩ বছর আগের আগুন আজও জ্বলছে সমুদ্রে!
দু’এক বছরের ঘটনা নয়— প্রায় ২৩ বছর আগের এক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ আজও ক্ষতচিহ্ন রেখে চলেছে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ২০০৩ সালে গ্রিনল্যান্ড সংলগ্ন সমুদ্রে যে অস্বাভাবিক উষ্ণতার ঢেউ উঠেছিল, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বরং সেই আগুন ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র।
২০০২ সালে পৃথিবীর নানা প্রান্তে তাপমাত্রা আচমকা বেড়ে যায়। তার পরের বছর, ২০০৩-এ গ্রিনল্যান্ডের উত্তরে আর্কটিক ও দক্ষিণ-পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগরের জল হঠাৎই অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে। উষ্ণ স্রোতের প্রবল ঢেউ বরফ গলিয়ে দেয়, এমনকি নরওয়ে সাগরের প্রায় ৭০০ মিটার গভীর জলও উষ্ণ হয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এত গভীরে এমন তাপপ্রবাহ আগে কখনও দেখা যায়নি।
এই তাপপ্রবাহের নেপথ্যে ছিল এক ‘স্রোতের গোলকধাঁধা’। সে সময় মেরু স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ স্রোত আটলান্টিক পেরিয়ে নরওয়ে সাগরে ঢুকে পড়ে। পাশাপাশি আর্কটিকের ঠান্ডা স্রোতও দুর্বল হয়ে যায়। ঠান্ডা আর গরম স্রোতের এই অস্বাভাবিক মেলবন্ধনই তৈরি করেছিল ভয়াবহ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ।
জার্মানি ও নরওয়ের একদল সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী শতাধিক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তুলে ধরেছেন। দলের প্রধান বিজ্ঞানী কার্ল মাইকেল ওয়ের্নারের কথায়, “২০০৩ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের বছর। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। কারণ, প্রতি বছরই সমুদ্রে তাপপ্রবাহের সংখ্যা বাড়ছে, আর তা ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।”
এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণীরা। ঠান্ডা জলে অভ্যস্ত অনেক প্রজাতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, আর উষ্ণ জলের উপযোগী প্রাণীরা জায়গা করে নিচ্ছে। বরফ গলার ফলে উত্তর আটলান্টিকে নতুন করে দেখা মিলছে বেলিন তিমি, নানা নতুন মাছের প্রজাতির। উল্টো দিকে, হুডেড সিল, নারওয়াল বা আর্কটিক দাঁতযুক্ত তিমির সংখ্যা কমছে চোখে পড়ার মতো।
সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছে আটলান্টিক কড মাছ। তাদের পরিচিত খাবার আর আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ঠান্ডা জলের খোঁজে তারা আরও উত্তরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এক সময় গিয়ে তাদের আর এগোনোর জায়গা থাকবে না। তখন এই জনপ্রিয় মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
সমুদ্রতলের উদ্ভিদজগতেও পরিবর্তন এসেছে। তাপপ্রবাহ শুধু প্রাণী নয়, গোটা সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নড়বড়ে করে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই সব কিছুর মূল কারণ মানুষেরই তৈরি। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাস যে তাপ ধরে রাখে, তার বড় অংশই শুষে নেয় সমুদ্র। ফলে সমুদ্র ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায়।
২৩ বছর পরেও যদি একটি তাপপ্রবাহের ক্ষত শুকোতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে আমাদের সমুদ্র ঠিক কতটা নিরাপদ— সেই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে।
‘স্পিরিট’-এ প্রভাসের ১৬০ কোটি! নায়িকাদের পারিশ্রমিকের ফারাক ঘিরে নতুন চর্চা