সমুদ্রের তলায় রাজকীয় আমোদ: আলেকজ়ান্দ্রিয়ায় মিলল হাজার বছরের পুরনো বিলাসবহুল প্রমোদতরীর রহস্য

সমুদ্রের তলায় রাজকীয় আমোদ মিশর মানেই রহস্যে মোড়া ইতিহাস। বালু আর সমুদ্রের নীচে লুকিয়ে থাকা অতীতের অজস্র গল্প বারবার চমকে দিয়েছে গবেষকদের। এ বার সেই তালিকায় যুক্ত হল আরও এক…

December 15, 2025
1 min read

সমুদ্রের তলায় রাজকীয় আমোদ

মিশর মানেই রহস্যে মোড়া ইতিহাস। বালু আর সমুদ্রের নীচে লুকিয়ে থাকা অতীতের অজস্র গল্প বারবার চমকে দিয়েছে গবেষকদের। এ বার সেই তালিকায় যুক্ত হল আরও এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। মিশরের আলেকজ়ান্দ্রিয়া উপকূলে সমুদ্রের তলায় খননকার্য চালাতে গিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খুঁজে পেলেন হাজার হাজার বছরের পুরনো একটি রাজকীয় প্রমোদতরীর ধ্বংসাবশেষ। এই আবিষ্কার নতুন কোনও ফারাওয়ের সমাধি নয়, বরং প্রাচীন মিশরের অভিজাত জীবনের এক অনন্য সাক্ষ্য।

প্রাচীন আলেকজ়ান্দ্রিয়া ছিল মিশরের অন্যতম সমৃদ্ধ ও জাঁকজমকপূর্ণ শহর। রাজপ্রাসাদ, মন্দির, বন্দর আর বিখ্যাত ফারোস বাতিঘর— সব মিলিয়ে এটি ছিল প্রাচীন বিশ্বের গর্ব। সেই শহরেরই ডুবে যাওয়া অংশ ‘পোর্টাস ম্যাগনাস’-এর কাছে, অ্যান্টিরোডোস দ্বীপের সংলগ্ন এলাকায় এই রাজকীয় নৌযানের সন্ধান মিলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বহু শতাব্দী আগে দ্বীপটি সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই প্রায় সাত মিটার গভীরে পলি চাপা পড়ে ছিল কাঠের তৈরি এই প্রমোদতরী।

গবেষকদের মতে, জাহাজটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৫ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৭ মিটার। এতটাই প্রশস্ত ছিল এটি যে ভিতরে একটি কক্ষ ও একটি প্যাভিলিয়ন তৈরির ব্যবস্থা ছিল। নৌকার তলদেশ ছিল সমতল এবং সামনের দিকে ধারালো শিকল বসানো, যা শান্ত ও অগভীর জলপথে চলার উপযোগী করে তোলা হয়েছিল। ইঞ্জিনের যুগের বহু আগে, প্রায় ২০ জনেরও বেশি মাল্লা দাঁ দিয়ে টেনে এই বিশাল নৌকাটি চালাতেন।

এই আবিষ্কার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ প্রথম শতাব্দীর গ্রিক ইতিহাসবিদ স্ট্রাবো তাঁর লেখায় এমনই এক বিলাসবহুল প্রমোদতরীর বর্ণনা দিয়েছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ২৯ থেকে ২৫ সালের মধ্যে আলেকজ়ান্দ্রিয়া ভ্রমণের সময় তিনি উল্লেখ করেন, রাজপরিবার ও উচ্চপদস্থ অমাত্যরা অবসরযাপন ও উৎসবের জন্য এই ধরনের নৌকা ব্যবহার করতেন। স্ট্রাবোর বিবরণ অনুযায়ী, নৌকার ভিতরে দিনরাত চলত গান-বাজনা, বাঁশির সুর আর উদ্দাম নৃত্য। খালের দু’পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ সেই রাজকীয় আমোদের দৃশ্য উপভোগ করত।

নৌকার কাঠামোয় পাওয়া গ্রিক ধাঁচের খোদাই ও চিহ্ন বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, এটি প্রথম শতাব্দীর প্রথমার্ধের নিদর্শন এবং আলেকজ়ান্দ্রিয়াতেই তৈরি হয়েছিল। নৌকাটি যে জায়গায় পাওয়া গেছে, তার মাত্র ৫০ মিটার দূরে রয়েছে মিশরীয় দেবী আইসিসের একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। এই কারণে প্রত্নতাত্ত্বিকদের একাংশের ধারণা, এটি কোনও ধর্মীয় জলযাত্রা বা আইসিসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিশেষ নৌ-অনুষ্ঠানের অংশ ছিল।

এই খননকার্য পরিচালনা করছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিটাইম আর্কিয়োলজির অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক গডিয়ো। তাঁর নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট ফর আন্ডারওয়াটার আর্কিয়োলজি দীর্ঘ দিন ধরেই আলেকজ়ান্দ্রিয়ার ডুবে যাওয়া অংশে গবেষণা চালাচ্ছে। গডিয়োর মতে, প্রায় ৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভূমিকম্প ও প্রবল জলোচ্ছ্বাসের ফলে এই নৌকাটি ডুবে যায় এবং তার সঙ্গে আইসিসের মন্দিরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমানে ইউনেস্কোর নির্দেশিকা অনুযায়ী, জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের স্বার্থে সমুদ্রের তলাতেই রাখা হবে। গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, বিশেষজ্ঞদের আশা, এই প্রমোদতরীর খোদাই ও কাঠামো বিশ্লেষণ করে প্রাচীন আলেকজ়ান্দ্রিয়ার দৈনন্দিন জীবন, ধর্মীয় আচার এবং অভিজাতদের অবসরযাপনের বিষয়ে আরও বহু অজানা তথ্য সামনে আসবে। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, ইতিহাস শুধু রাজ্যজয় আর যুদ্ধের গল্প নয়— তার গভীরে লুকিয়ে আছে আনন্দ, সংগীত আর বিলাসেরও এক সমৃদ্ধ অধ্যায়।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *