হরমুজে ‘মাইনের খেলা’!
ইতিহাস মাঝে মাঝেই ফিরে আসে—তবে নতুন রূপে। ৩৮ বছর আগে যেমন হয়েছিল, ঠিক তেমনই কৌশল ব্যবহার করে আবারও আন্তর্জাতিক জলপথে চাপে ফেলল ইরান। সম্মুখ যুদ্ধ নয়, বরং ছোট নৌকা আর সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে থাকা মাইন—এই নিঃশব্দ অস্ত্রই হয়ে উঠেছে বড় শক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
১৯৮৭ সালের ঘটনা। পারস্য উপসাগরের মাঝে ছোট্ট ফারসি আইল্যান্ড থেকে রাতের অন্ধকারে বেরিয়েছিল একটি নৌকা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা সমুদ্রের বুকে পেতে দেয় একাধিক সামুদ্রিক মাইন—নিঃশব্দ অথচ ভয়ঙ্কর ফাঁদ। পরদিনই তার ফল মিলল। মার্কিন পতাকাবাহী বিশাল তেলবাহী জাহাজ ‘ব্রিজেটন’ এক মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটি ডুবেনি ঠিকই, কিন্তু এই ঘটনাই প্রশ্ন তুলে দেয় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর।
এই হামলার প্রেক্ষাপট ছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধের ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’। কুয়েতের তেলবাহী জাহাজগুলিকে রক্ষা করতে আমেরিকা শুরু করেছিল ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’। কিন্তু সেই অভিযানের মাঝেই ইরানের এই কৌশলী আঘাত কার্যত চমকে দেয় ওয়াশিংটনকে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়—যে যুদ্ধজাহাজগুলি ট্যাঙ্কারকে রক্ষা করছিল, তাদের কাছেই ছিল না পর্যাপ্ত মাইন শনাক্ত করার প্রযুক্তি। ফলে উল্টে সেই ট্যাঙ্কারই হয়ে ওঠে যুদ্ধজাহাজগুলির ‘ঢাল’!
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু সামরিক ব্যর্থতা নয়—বরং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে বড় জয় ছিল ইরানের। অল্প খরচের প্রযুক্তি দিয়ে কীভাবে বিশাল সামরিক শক্তিকে চাপে ফেলা যায়, তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে এই ঘটনা।
সময়ের স্রোত বয়ে গেছে, কিন্তু কৌশল বদলায়নি। ২০২৬ সালে আবার সেই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ইরান। অভিযোগ, সমুদ্রপথে একাধিক আধুনিক ‘মাহম’ মাইন বসানো হয়েছে—যেগুলি আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। এই মাইন শুধু চৌম্বক ক্ষেত্র নয়, জাহাজের শব্দ, এমনকি জলের চাপের পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারে। ফলে এগুলি খুঁজে বের করা আরও কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যায়। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আমেরিকা পুরনো মাইন পরিষ্কার করার জাহাজ সরিয়ে নতুন প্রযুক্তির উপর নির্ভর করছে—ড্রোন, হেলিকপ্টার, দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। কিন্তু আধুনিক মাইনের সামনে এই পদ্ধতি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে।
এখানেই উঠে আসছে ব্রিটিশ প্রযুক্তির প্রসঙ্গ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উদ্ভাবিত ‘ডিগসিং’ পদ্ধতি—যার মাধ্যমে জাহাজের চৌম্বকত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়—আজও প্রাসঙ্গিক। তবে আধুনিক মাইনের বহুমুখী সেন্সরের বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তিকেও আরও উন্নত করতে হচ্ছে।
বর্তমানে ব্রিটেন নতুন ধরনের রোবোটিক সাবমেরিন, লেজার স্ক্যানিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মাইন শনাক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। অনেকেই একে বলছেন ‘ব্রিটিশ ঝাঁটা’—যা হয়তো সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে থাকা বিপদ পরিষ্কার করতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে থাকবে? আপাতত যুদ্ধবিরতির ফলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও, হরমুজের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই নিঃশব্দ হুমকি এখনও বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে।
শেষ লড়াইয়ের গল্প: জল থেকে তোলার পরও বেঁচে ছিলেন রাহুল, তবু বাঁচানো গেল না