সোনার ভরাডুবি সামলাচ্ছে মস্কো!
২৫ বছরে প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ার অর্থনীতি যুদ্ধের চাপ সামাল দিতে মুশকিলের মুখে। ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান সংঘাতের চার বছর কেটে গেলেও, ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয়ের ফলে মস্কোর কোষাগারে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বাধ্য হয়ে রাশিয়া তাদের নিরাপদ সঞ্চয়ে হাত দিতে শুরু করেছে—একটি ঘটনা যা ২০০২ সালের পর আর ঘটেনি।
২০২২ সালে ইউক্রেনের ওপর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। সেসব চাপে প্রথমে মনে করা হয়েছিল, ক্রেমলিনের অর্থনীতি নাভিশ্বাস উঠবে। কিন্তু পুতিন ও তাঁর অর্থনীতিবিদরা দক্ষভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন। মন্দার জালে আটকে না পড়ে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই অর্থ উপার্জনের পথ বের করেছেন তারা।
তবে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় রাশিয়ার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বার্লিনের সংবাদমাধ্যম ‘বিএনই ইন্টেলিনিউজ়’ অনুসারে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করা হয়েছে ৫ লক্ষ আউন্স সোনা। এই বিক্রির ফলে রাশিয়ার জাতীয় সম্পদ তহবিল বা ন্যাশনাল ওয়েলথ ফান্ড থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে।
২০২২–২০২৫ সালের মধ্যে সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রার সম্মিলিত বিক্রি ১৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ৩৫ হাজার কোটি ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে মস্কো। এর ফলে রাশিয়ার মোট সোনার ভান্ডার চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
রাশিয়ার বাজেটে এখন সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে। ফলে অসামরিক খাত, শিল্প এবং বিনিয়োগে প্রভাব পড়ছে। তেলের আয়ও কমে এসেছে, যা আগে দেশের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। ২০২৫ সালের শেষে জিডিপির বাজেট ঘাটতি আনুমানিক ২.৬ শতাংশ, যা প্রাথমিক পূর্বাভাসের তুলনায় ০.৫ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তব ঘাটতি ৩–৩.৫ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রিজ়ার্ভ ৮০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সোনার সঞ্চয়ও রয়েছে। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সম্পদ প্রায় পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
২০১৪ সালে ক্রাইমিয়া অধিগ্রহণের পর থেকে এবং ২০২২ সালের যুদ্ধের পর থেকে, রাশিয়া ডলার নির্ভরতা কমাতে সোনায় বেশি মনোযোগী হয়েছিল। এখন বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় (কিছু ক্ষেত্রে ৫,০০০ ডলার প্রতি আউন্সের বেশি) রাশিয়া এটি বিক্রি করে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে চাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক-কেন্দ্রিক ব্যয়ের কারণে অসামরিক খাতে তীব্র চাপ পড়ছে। শিল্পে ভর্তুকি কমছে, মূল্যবৃদ্ধি বেড়ে যাচ্ছে। আর্থিক মন্ত্রী ম্যাক্সিম রেশেতনিকভও সতর্ক করেছেন, মন্দা ধীরে ধীরে দেশ জুড়ে প্রসারিত হতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায়, যুদ্ধের চাপ ক্রেমলিনের অর্থনীতির কোমর ভেঙে দিচ্ছে। দেশের ‘ঘরের লক্ষ্মী’ বিক্রি করে মস্কো এই ভরাডুবি সামলানোর চেষ্টা করছে, যেখানে প্রতিটি আউন্স সোনা এখন এক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক।
শেষ লড়াইয়ের গল্প: জল থেকে তোলার পরও বেঁচে ছিলেন রাহুল, তবু বাঁচানো গেল না