আইআইটি-র প্রাক্তনী
জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে অনেকেই স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কখনও কখনও সবার পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকে না। তবে, কিছু মানুষ আছেন যারা নিজের পেছনে না তাকিয়ে অন্যদের স্বপ্নপূরণের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এমনই একজন মানুষ হলেন রতিকান্ত ঘোষ, সল্টলেকের বাসিন্দা এবং আইআইটি খড়্গপুরের প্রাক্তনী। তিনি এখন জলপাইগুড়ির দুঃস্থ পড়ুয়াদের জন্য এক আশার বাতিঘর হয়ে উঠেছেন।
মাস পাঁচেক আগে জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার উমেশ গণপত খণ্ডবহাল এক অনুষ্ঠানে জানাচ্ছিলেন, কীভাবে তিনি দ্বাদশ শ্রেণিতে ‘ফেল’ হওয়ার পরও নিজের ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যাবসায় দিয়ে আইপিএস অফিসার হয়েছেন। তাঁর এই গল্প শুনে এক ছাত্রী, যিনি হলঘরের শেষ আসনে বসে ছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “স্যর, আমিও পড়তে চাই।” কিন্তু সেই ছাত্রীর পরিবারে পড়াশোনার জন্য আর্থিক সঙ্গতি ছিল না।
এই ঘটনাটি সংবাদপত্রে পড়েন রতিকান্ত। তিনি অনুভব করেন যে, তার পাশে দাঁড়িয়ে এই ছাত্রীর মতো আরও অনেক দুঃস্থ, অথচ মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাইছেন, কিন্তু তাঁদের হাতে উপযুক্ত সমর্থন নেই। এই অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতে রতিকান্ত যোগাযোগ করেন পুলিশ সুপার উমেশ গণপত খণ্ডবহালের সঙ্গে এবং তিনি জানান, দুঃস্থ পড়ুয়াদের সাহায্য করার জন্য কিছু করতে চান। পুলিশ সুপার তার এই প্রস্তাবে সম্মতি জানান এবং পাঁচজন পড়ুয়ার বিবরণ রতিকান্তের কাছে পাঠান।
এরপর রতিকান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তিনি প্রত্যেক ছাত্রীর জন্য মাসে দেড় হাজার টাকা করে পাঠাবেন, যাতে তারা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। গত তিন মাস ধরে রতিকান্ত প্রতিটি ছাত্রীকে নিয়মিত এই অর্থ সাহায্য পাঠিয়ে আসছেন।
এবার, জলপাইগুড়ি জেলা পুলিশ রতিকান্তকে আমন্ত্রণ জানায় জলপাইগুড়িতে আসার জন্য, এবং শুক্রবার তিনি সেখানে পৌঁছান। তিস্তা উদ্যানে পাঁচটি দুঃস্থ পরিবারের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা জীবনে পড়াশোনা করে স্বনির্ভর হয়ে ওঠো, সেটাই হবে আমার বড় উপহার। সৎ থেকো, সবার প্রতি ভালোবাসা রাখো, মনের কথা লিখে যাকে চাও চিঠি পাঠাও।”
রতিকান্ত আরও বলেন, “আন্তরিকভাবে নিজের লক্ষ্য অর্জনে লেগে থাকো, সাফল্য আসবেই। বিশ্বটা তোমাদের মতো, আমাদের মতো সবার জন্যই।” পুলিশ সুপার উমেশ গণপত খণ্ডবহালও শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে বলেন, “আপনাদের কঠোর পরিশ্রম ও লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে সাফল্য অর্জন করতে হবে। জীবনটা কঠিন হলেও, কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।”
রতিকান্তের এই পদক্ষেপ শুধু একটি সাহায্য নয়, বরং তিনি সেখানকার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ একদিকে যেমন পড়ুয়াদের জীবনে আশা জাগাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে সমাজে আরও মানুষকে এইভাবে সহানুভূতির হাত বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করছে।