চাঁদের মাটিতে টিকে থাকল অদম্য ‘জল ভালুক’!
‘জল ভালুক’ নামে পরিচিত টারডিগ্রেড প্রাণীগুলোর বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এই আণুবীক্ষণিক প্রাণীগুলোর জীবনযাত্রা ও টিকে থাকার ক্ষমতা সত্যিই অভাবনীয়। সম্প্রতি, চাঁদের কঠিন পরিবেশে কীভাবে টারডিগ্রেডেরা টিকে থাকতে পারে তা নিয়ে গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, যা বৈজ্ঞানিকদের নতুন গবেষণার পথে নিয়ে যাচ্ছে।
কী এই টারডিগ্রেড?
টারডিগ্রেড শব্দটি শুনলে প্রথমেই মনে হতে পারে এটি কোনো অত্যাধুনিক রোবটের নাম। কিন্তু এই ছোট্ট প্রাণীগুলি কোনো রোবট নয়, বরং প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এক প্রকার ক্ষুদ্রজীব, যেগুলি প্রায় এক মিলিমিটারেরও কম দৈর্ঘ্যের এবং আট পায়ের অধিকারী। ‘ওয়াটার বেয়ার’ বা ‘জল ভালুক’ নামেও পরিচিত এই প্রাণীগুলি পৃথিবীর প্রায় ১৫০০ প্রজাতির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এদের শারীরিক গঠন এমন যে এরা কঠিনতম পরিস্থিতিতেও বেঁচে থাকার অদম্য ক্ষমতা রাখে।
মহাকাশে চাঁদের মাটিতে টারডিগ্রেড
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইজ়রায়েলের মহাকাশযান ‘বেরেশিট’ চাঁদে পাঠানো হয়, আর তাতে বহন করা হয়েছিল কিছু টারডিগ্রেড। উদ্দেশ্য ছিল, চাঁদের রুক্ষ পরিবেশে এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলির টিকে থাকার ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা। তবে ‘বেরেশিট’ মহাকাশযানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে। এতে ধারণা করা হয়, এই ছোট্ট প্রাণীগুলির জীবন শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক মহল এ বিষয়ে নতুন ধারণা প্রকাশ করেছেন যে, চাঁদের মাটিতে বেঁচে থাকতে পারে এই ‘জল ভালুক’।
টারডিগ্রেডের অদম্য ক্ষমতার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, এই টারডিগ্রেডের প্রজাতিগুলোর এমন জিন রয়েছে যা তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সহ্য করতে পারে। প্রায় হাজারেরও বেশি জিন পাওয়া গেছে যেগুলি রেডিয়েশনের সংস্পর্শে এলে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ও ডিএনএ মেরামত করতে পারে। এই গবেষণা বৈজ্ঞানিকদের অনুমানকে আরও শক্তিশালী করেছে যে, মহাকাশের কঠিনতম পরিবেশেও টারডিগ্রেডেরা বেঁচে থাকতে পারে।
চীনের গবেষণা সংস্থা ‘বেজিং ইনস্টিটিউট অফ লাইফোমিক্স’-এর জীববিজ্ঞানী লিংকিয়াং ঝাং ও তাঁর দল একটি নির্দিষ্ট টারডিগ্রেড প্রজাতির জিনোম সিকোয়েন্স করে দেখেছেন, এতে প্রায় ১৪,৭০১টি জিন রয়েছে, যেগুলির মধ্যে ৩০ শতাংশ অন্যান্য টারডিগ্রেডের থেকে আলাদা। এর জিনগুলো রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসলে বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামত করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রজাতির গঠন নিয়ে আরও গবেষণা করে মহাকাশযাত্রায় রেডিয়েশন থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষার উপায় বের করা যাবে।
টারডিগ্রেডের বিস্ময়কর সহনশীলতা
টারডিগ্রেডের টিকে থাকার ক্ষমতা অসাধারণ এবং বৈজ্ঞানিক মহলে এদের ‘অবিনশ্বর’ বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর বাইরে মহাকাশের চাপহীন পরিবেশ, তীব্র রেডিয়েশন, চরম তাপমাত্রা অথবা তীব্র শীত—কোনো কিছুই এই প্রাণীগুলিকে বিনষ্ট করতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এরা ১৫০ ডিগ্রি থেকে হিমাঙ্কের ২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এমনকি এরা ৩০ বছর পর্যন্ত খাদ্য ও জল ছাড়াই টিকে থাকতে পারে।
টারডিগ্রেডের গবেষণার ভবিষ্যৎ ও মানবকল্যাণ
বিজ্ঞানীদের মতে, এই জীবের গঠন মানুষের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। টারডিগ্রেডের বিশেষ জিন ব্যবহার করে ভবিষ্যতে রেডিয়েশন থেরাপিতে আক্রান্ত রোগীদের সহনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, পারমাণবিক দূষণ ও ক্যানসার চিকিৎসাতেও এই ক্ষুদ্র প্রাণী হতে পারে একটি যুগান্তকারী সমাধান।
বৈজ্ঞানিক মহলে নতুন আলোড়ন
জল ভালুককে ঘিরে এমন চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের জন্য গবেষকদের উৎসাহ আরও বেড়ে চলেছে। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীগুলি যে চরমতম পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে তা দেখে অনেকেই বিস্মিত। এদের বিশেষ জিন প্রযুক্তি এবং প্রোটিন ব্যবহারের সক্ষমতা বৈজ্ঞানিক মহলে নতুন আলোড়ন তুলেছে।
সত্যিই, সূর্য না মরা পর্যন্ত এই প্রাণীগুলি হয়তো পৃথিবীর বাইরে অন্য কোথাও টিকে থাকবে। টারডিগ্রেডের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের জন্য এক অনুপ্রেরণা, যেটি মানবকল্যাণে নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে।