মমতাকে চোর বলা হলে চোখে জল আসে!
রাজনৈতিক পালাবদলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে আগের মতো আর অনেককেই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কবি জয় গোস্বামীর দাবি, মমতার প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত ভালবাসা এখনও অটুট। নেত্রীর রাজনৈতিক বিপর্যয়ে তিনি দুঃখ পান। তাঁর কথায়, মমতাকে ‘চোর’ বলা হলে চোখে জল আসে। তবে এই আবেগের পাশাপাশি মমতার রাজনৈতিক ভুল, দুর্নীতি নিয়ে বিতর্ক এবং তাঁর চারপাশের মানুষদের ভূমিকা নিয়েও সরব হয়েছেন কবি।
আনন্দবাজার ডট কমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয় জানিয়েছেন, তাঁর জীবনে মমতার অবদান তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। একাধিক বার গুরুতর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল তাঁর। জয় জানিয়েছেন, পাঁচ বার আনন্দবাজার পত্রিকা এবং পাঁচ বার মমতা তাঁর চিকিৎসার ক্ষেত্রে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সাহায্যের কথা মনে রেখেই তিনি অকৃতজ্ঞ হতে চান না।
মমতার কোন দিকটি মুগ্ধ করেছিল জয়কে?
জয়ের কথায়, মমতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৃণমূল তৈরির আগেই। পরে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় মহাশ্বেতা দেবীর ডাকে একটি ঘরোয়া জমায়েতে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়। সেই রাতে মমতা নন্দীগ্রাম যাওয়ার আগে মুড়ি-চানাচুর খাচ্ছিলেন। কাজের কথা বলতে গিয়ে মমতা বলেছিলেন, “কাজ করা ছাড়া আর কী কাজ আছে আমাদের, জয়দা?”
সেই কথাটি আজও তাঁর মনে রয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন কবি। তাঁর মতে, দরিদ্র মানুষের প্রতি মমতার স্বাভাবিক মমত্ববোধ ছিল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার প্রবণতা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।
তবে জয়ের পর্যবেক্ষণ, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে মমতার সঙ্গে সাধারণ মানুষ এবং প্রকৃত শুভানুধ্যায়ীদের দূরত্ব বেড়েছে। ২০১১ সালের পর শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠকের মতো উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায় বলেও দাবি করেছেন তিনি। তাঁর মতে, ধীরে ধীরে মমতার চারপাশের বৃত্ত বদলে যায় এবং পুরনো শুভানুধ্যায়ীরা দূরে সরে যেতে থাকেন।
‘নেত্রীর জীবন সাদাসিধে, পার্শ্বচরদের জীবন বিলাসবহুল’
দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে জয় বলেন, মমতার ব্যক্তিগত জীবন সাদাসিধে হলেও তাঁর চারপাশের কিছু মানুষের জীবনযাত্রা বিলাসবহুল। তাঁর অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যক্তিদের প্রভাব বেড়েছে। মমতা নিজে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে তিনি মনে করেন না, তবে তাঁর চারপাশে কারা জায়গা করে নিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কবি।
জয়ের মতে, মমতার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ভুল মানুষকে বিশ্বাস করা। তবে তাঁর আশা, বড় মানুষরাও নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। ক্ষমতায় থাকাই যে মানুষের সেবা করার একমাত্র পথ নয়, সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
সাহিত্যজগতেও ‘হুমকি সংস্কৃতি’র অভিযোগ
সাক্ষাৎকারে বাংলা সাহিত্যজগতের কথাও বলেছেন জয়। তাঁর দাবি, সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে হুমকি ও প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তরুণ কবিদের একাংশকে নিজেদের মত অনুযায়ী চলতে বাধ্য করা হত। পরে সেই ব্যক্তিদের কয়েক জন রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যান।
বগটুই ও হাঁসখালির ঘটনা নিয়ে কবিতা লেখার পর এক মন্ত্রী তাঁকে ফোন করে মমতার বদনাম করার অভিযোগ করেছিলেন বলেও জানিয়েছেন জয়। বিষয়টি মমতাকে জানালে তিনি উত্তরে লেখেন, জয় স্বাধীন শিল্পী, তাঁর যা মনে হয় তা-ই লিখবেন। জয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, মমতা তাঁকে স্বাধীন ভাবে লেখার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
বর্তমান শাসকদলের আমলেও কয়েকটি অনুষ্ঠানে তাঁর কবিতা পাঠ ও বক্তৃতা বাতিল করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন জয়। যদিও উদ্যোক্তাদের অনুরোধে তিনি তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করেননি। তাঁর দাবি, সাহিত্যজগতেরই এক ব্যক্তি রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এমনটা করছেন। এই অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায়নি।
‘তাঁর দুর্দশায় দুঃখ পাই’
মমতার সঙ্গে এখন আর নিয়মিত যোগাযোগ নেই জয়ের। তাঁর কথায়, ব্যক্তিগত ভাবে মমতার প্রতি ভালবাসা থাকলেও তাঁকে সহানুভূতি জানাতে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। তাতে মমতাকে অসম্মান করা হতে পারে বলেই মনে করেন তিনি।
জয়ের বক্তব্য, একা লড়াই করে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছনো, মানুষের ভালবাসা পাওয়া এবং তার পর এমন পতনের মুখোমুখি হওয়া—এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বিচলিত করে। তাই মমতার রাজনৈতিক ভুলের সমালোচনা করলেও তাঁর দুর্দশায় দুঃখ পান কবি। ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক—এই তিনের টানাপড়েনই ধরা পড়েছে জয়ের কথায়।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।