চাঁদের পাথরে লুকিয়ে ‘চৌম্বক বিস্ময়’!
চাঁদ— আমাদের নিকটতম মহাজাগতিক সঙ্গী। কিন্তু তার বুক থেকে তুলে আনা কয়েকটি পাথর যে এতদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধাঁধায় ফেলবে, তা কেউ ভাবেনি। অবশেষে সেই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA-র Apollo missions-এর সময় চাঁদ থেকে আনা পাথরের নমুনা নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা চলছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য— চাঁদের কিছু পাথরে চৌম্বকশক্তি এতটাই বেশি, যা অনেক ক্ষেত্রে পৃথিবীকেও ছাপিয়ে যায়!
চাঁদের মতো ‘শান্ত’ গ্রহে এত শক্তি এল কোথা থেকে?
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, চাঁদের আকার ছোট হওয়ায় তার অভ্যন্তরীণ শক্তি কম। ফলে তার magnetic field সাধারণত দুর্বল হওয়ার কথা।
পৃথিবীর মতো শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করার জন্য যে অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা দরকার, তা চাঁদের নেই বললেই চলে। কিন্তু পরীক্ষাগারে চাঁদের পাথর পরীক্ষা করে দেখা গেল— বাস্তব চিত্র যেন একেবারেই আলাদা!
৩৫০ কোটি বছরের পুরনো রহস্য
যে পাথরের নমুনাগুলি পরীক্ষা করা হয়েছে, সেগুলির বয়স প্রায় ৩৫০ কোটি বছর। এই পাথরগুলির মধ্যে অস্বাভাবিক মাত্রায় চৌম্বকত্ব লক্ষ্য করা গেছে।
এই অমিলই এতদিন বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছিল— দুর্বল চৌম্বকক্ষেত্রের চাঁদে এমন শক্তিশালী চৌম্বকত্ব এল কীভাবে?
নতুন গবেষণায় মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
সম্প্রতি University of Oxford-এর একদল গবেষক এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে এগিয়ে আসেন। তাঁদের গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Nature Geoscience-এ।
তাঁদের মতে, চাঁদের ইতিহাসে একসময় ঘটেছিল এক বিরল ভূতাত্ত্বিক ঘটনা— এক ধরনের “চৌম্বক বিস্ফোরণ”।
এই ঘটনাটি স্থায়ী ছিল না, বরং কয়েক হাজার বছর মাত্র। কিন্তু সেই সময়েই তৈরি হয়েছিল অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র, যার ছাপ রয়ে গেছে ওই পাথরগুলিতে।
টাইটানিয়ামই কি মূল চাবিকাঠি?
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। যেসব পাথরে চৌম্বকত্ব বেশি, সেগুলিতে Titanium-এর উপস্থিতিও বেশি।
বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের অভ্যন্তরে টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ পদার্থ গলতে শুরু করলে তাপের প্রবাহ বাড়ে। এর ফলে সাময়িক ভাবে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
এই প্রক্রিয়াই সম্ভবত সেই অস্বাভাবিক চৌম্বকত্বের কারণ।
সব জায়গায় নয়, নির্দিষ্ট অঞ্চলেই এই ঘটনা
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল— এই শক্তিশালী চৌম্বকত্ব চাঁদের সর্বত্র দেখা যায়নি।
অ্যাপোলো অভিযানের সময় যেসব জায়গা থেকে পাথর সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেগুলি মূলত ‘মেয়ার ব্যাসল্ট’ অঞ্চল। এই অঞ্চলেই এমন বৈশিষ্ট্য বেশি পাওয়া গেছে।
অন্য জায়গায় চাঁদের চৌম্বকক্ষেত্র এখনও পৃথিবীর তুলনায় অনেক দুর্বল।
এখনও বাকি অনেক প্রশ্ন
তবে বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন, এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাতে থাকা নমুনা খুবই সীমিত, ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয়েছে।
তবুও এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করেছে— চাঁদের ইতিহাস অনেক বেশি জটিল এবং ঘটনাবহুল, যা আমরা এতদিন পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
ভবিষ্যতের অপেক্ষা
এই রহস্যের পুরো সমাধান এখনও হয়নি। তবে নতুন গবেষণা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
আগামী দিনে আরও নমুনা ও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে হয়তো চাঁদের এই ‘চৌম্বক রহস্য’-এর পূর্ণ ব্যাখ্যা মিলবে।
আর তখন হয়তো আমরা আরও ভালভাবে বুঝতে পারব— আমাদের সবচেয়ে কাছের মহাজাগতিক প্রতিবেশী আসলে কতটা অজানা!
ধীরে ধীরে কমান চিনির অভ্যাস: স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কার্যকর কয়েকটি সহজ উপায়