আফগান নারীদের জন্য জানলা বন্ধের ফরমান
আফগানিস্তানে মেয়েদের জন্য বাড়ি এবং বাইরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে তালিবান। বাড়ির অন্দরমহলে জানলা রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তারা জানিয়েছে, নারীদের গৃহস্থালির কাজ দেখতে পেলে তা পুরুষদের অশালীন কাজে প্ররোচিত করতে পারে।
নতুন ফরমান: জানলার উপর নিষেধাজ্ঞা
তালিবান সরকারের তরফে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাড়ির যে অংশে নারীরা কাজ করেন, যেমন রান্নাঘর বা অন্যান্য অন্দরমহল, সেখানে জানলা রাখা যাবে না। প্রতিবেশী বা বাইরের লোক যাতে ওই সব ঘরের ভেতর দেখতে না পারে, সেজন্য জানলা বুজিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে কোনও নারীর উপস্থিতি বা কর্মকাণ্ড দেখার সুযোগ থাকলে জানলার পরিবর্তে পাঁচিল তোলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সরকারি মুখপাত্র জ়বিউল্লাহ মুজাহিদ এই নির্দেশিকার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, “যদি নারীদের রান্নাঘরে কাজ করতে বা কুয়ো থেকে জল তুলতে দেখা যায়, তবে তা অশালীন কাজের কারণ হতে পারে।”
সরকারি নজরদারি
এই ফরমান কার্যকর করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং পুরসভার আধিকারিকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা নজর রাখবে, কোনও বাড়ির জানলা প্রতিবেশীর বাড়ির ভেতরের দৃশ্য দেখার সুযোগ দেয় কি না। যদি এমন পরিস্থিতি পাওয়া যায়, তবে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তালিবানের শাসন ও নারী-নির্যাতন
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালিবান আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করার পর থেকেই নারীদের জীবনে একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মেয়েদের উচ্চ প্রাথমিকে পড়াশোনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, চাকরি করার অধিকারে কড়া বাধা এসেছে, এমনকি প্রকাশ্যে চলাফেরা করার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা।
সম্প্রতি তালিবান সরকার আরও একটি আইন প্রণয়ন করেছে, যেখানে নারীদের গান গাওয়া বা কবিতা আবৃত্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তালিবানের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামিক আইনের বিরোধী।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
তালিবানের এই কঠোর ও গোঁড়া নিয়মকানুন নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে এসেছে আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলি। তারা আফগান নারীদের মৌলিক অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। তবে, আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে তালিবান তাদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।
নারী-অধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ছায়া
তালিবানের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই আফগান নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার একেবারে খর্ব হয়েছে। একের পর এক ফতোয়া জারি করে নারীদের কার্যত বন্দি করে রাখা হয়েছে তাদের ঘরের মধ্যে। মেয়েদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া, কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া, এবং সর্বশেষ এই জানলা বন্ধের ফরমান—সব মিলিয়ে তালিবানের নীতিগুলি নারীদের জীবন আরও সংকুচিত করে তুলছে।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
তালিবানের এই কঠোর নীতির ফলে আফগানিস্তানের সমাজে গভীর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল যদি তালিবানের এই নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে আফগান নারীদের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হতে পারে।
উপসংহার
তালিবানের এই নতুন ফরমান নারীদের প্রতি তাদের গোঁড়া এবং রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি উদাহরণ। জানলা বন্ধের এই নির্দেশ শুধুমাত্র নারীদের জীবনযাত্রার উপর আরও এক নতুন বন্ধন আরোপ করছে না, এটি নারীদের অধিকার হরণের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা নারীদের উন্নয়ন এবং স্বাধীনতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে, যা গোটা আফগানিস্তানের সামাজিক কাঠামোকেও দুর্বল করবে।