৯/১১-এর দু’দিন আগে খুন ‘তালিবানের কাঁটা’!
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। মঙ্গলবারের সেই সকাল বদলে দিয়েছিল আমেরিকার ইতিহাস, প্রভাব ফেলেছিল গোটা বিশ্বের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার এবং ওয়াশিংটনের পেন্টাগন-সহ একাধিক জায়গায় ভয়াবহ হামলা চালায় আল কায়েদার সদস্যেরা। কিন্তু সেই হামলার ঠিক দু’দিন আগে আফগানিস্তানে ঘটে গিয়েছিল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যার সঙ্গে পরবর্তী মার্কিন অভিযান এবং আফগানিস্তানের ক্ষমতার সমীকরণের যোগ নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে।
৯ সেপ্টেম্বর, ২০০১। ৯/১১-এর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে আল কায়েদার হামলায় নিহত হন তালিবানবিরোধী আফগান নেতা আহমদ শাহ মাসুদ। উত্তর আফগানিস্তানে ‘নর্দার্ন অ্যালায়েন্স’-এর অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন তিনি এবং তালিবানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন।
মাসুদের জনপ্রিয়তা এবং সামরিক প্রভাব তালিবানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, তালিবানের সঙ্গে আল কায়েদার ঘনিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে মাসুদকে সরিয়ে দেওয়া তাদের জন্য কৌশলগত ভাবে সুবিধাজনক ছিল।
মাসুদের উপর হামলার ঘটনাটিও ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। দুই ব্যক্তি বেলজিয়ামের টেলিভিশন সাংবাদিকের পরিচয় দিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পঞ্জশির উপত্যকায় পৌঁছেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তা তল্লাশিও করা হয়েছিল। কিন্তু ক্যামেরার ভিতরে লুকিয়ে রাখা বিস্ফোরকের বিষয়টি ধরা পড়েনি। সাক্ষাতের সময় সেই বিস্ফোরক ফাটানো হয়। গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান মাসুদ।
৯ সেপ্টেম্বর হামলা হলেও নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ১৫ সেপ্টেম্বরের আগে তাঁর মৃত্যুর কথা প্রকাশ্যে জানায়নি। ফলে ৯/১১-এর ঠিক আগে তাঁর হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ সামনে আসে।
মাসুদের মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন হয়েছিল সিআইএ
মাসুদের মৃত্যুর খবর আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-কেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। সিআইএ-র কর্মকর্তা গ্যারি বার্নটসেন পরে স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন, খবরটি শুনে তাঁর আশঙ্কা হয়েছিল যে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের কার্যত অবসান ঘটতে পারে।
তৎকালীন সিআইএ প্রধান জর্জ টেনেট অবশ্য মনে করেছিলেন, মাসুদ ছাড়াও আফগানিস্তানে তাঁদের অন্য যোগাযোগ ছিল। পরে তিনি লিখেছিলেন, আল কায়েদার হাতে মাসুদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড তাঁদের পরিকল্পনাকে বড় ধাক্কা দিতে পারত। তবে উত্তর আফগানিস্তানের অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হয়েছিল।
টেনেটের বর্ণনায় ৯ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের গোয়েন্দাপ্রধান জেনারেল মাহমুদ আহমেদের সঙ্গে বৈঠকের কথাও উঠে আসে। তালিবান ও আল কায়েদা নিয়ে আলোচনার সময় মাহমুদ তালিবান নেতা মোল্লা ওমরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে টেনেট দাবি করেন।
তার দু’দিন পরেই আমেরিকায় ৯/১১
৯ সেপ্টেম্বর মাসুদ হত্যার পর ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় আছড়ে পড়ে আল কায়েদার ভয়াবহ হামলা। ১৯ জন জঙ্গি চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে। প্রথম দু’টি বিমান নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার্সে আঘাত করে। তৃতীয় বিমানটি পেন্টাগনে আছড়ে পড়ে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভেনিয়ায় ভেঙে পড়ে।
সব মিলিয়ে প্রায় ৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারান। হামলার পর আমেরিকা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক অভিযান শুরু করে। আফগানিস্তানেও তালিবান সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। সেই সময় নর্দার্ন অ্যালায়েন্স মার্কিন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সহযোগী হয়ে ওঠে—যে জোটের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন আহমদ শাহ মাসুদ।
৯/১১-এর ২৫ বছর পরও তাই মাসুদের হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে তাঁর হত্যার সঙ্গে ৯/১১-এর পরিকল্পনার সরাসরি সম্পর্ক বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে যে সব দাবি করা হয়, সেগুলির সবটাই সমান ভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। নিশ্চিত তথ্যের পাশাপাশি গোটা ঘটনাকে ঘিরে থাকা গোয়েন্দা রিপোর্ট ও পরবর্তী বিশ্লেষণও ইতিহাসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।