ইরান যুদ্ধ ঘিরে চাপের মুখে পাকিস্তান!
পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে সংঘাত যত জটিল হচ্ছে, ততই কঠিন অবস্থায় পড়ছে পাকিস্তান। এক দিকে আন্তর্জাতিক চাপ, অন্য দিকে দেশের ভিতরের ক্ষোভ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মধ্যস্থতার দায়িত্ব নেওয়াটা এখন বুমেরাং হয়ে উঠছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি The New York Times-এর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরান ইস্যুতে পাকিস্তানের ভূমিকা ঘিরে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। অনেকের মতে, এই পরিস্থিতিতে দেশটা যেন “বারুদের স্তূপের উপর” দাঁড়িয়ে আছে।
পাকিস্তানের সমাজ কাঠামোয় শিয়া ও সুন্নি—এই দুই প্রধান ইসলামী সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে। কিন্তু ইরান ইস্যুতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ছবি। সাধারণত একে অপরের বিরুদ্ধে থাকা এই দুই গোষ্ঠীই এখন একসঙ্গে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সরব। ইরানের পাশে দাঁড়ানো উচিত—এই দাবি উঠছে দুই পক্ষ থেকেই।
সমস্যা আরও গভীর হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে পাকিস্তানকে এমন কিছু অবস্থান নিতে হচ্ছে, যা দেশের একাংশের কাছে অস্বস্তিকর। আবার একই সঙ্গে ইজ়রায়েল প্রসঙ্গও সামনে আসছে, যা পাকিস্তানের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইরান সংঘাতের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। করাচি, ইসলামাবাদ-সহ বিভিন্ন শহরে মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়। অভিযোগ ওঠে, সেই বিক্ষোভ দমাতে কড়া পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন, এমনকি গুলিচালনার ঘটনাও ঘটে। যদিও এই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
এই অবস্থায় সেনা নেতৃত্ব ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সেই বৈঠক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনীর তরফে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থেই আলোচনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসল চ্যালেঞ্জটা শুধু রাজনৈতিক নয়—সামরিক ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। সেনাবাহিনীর মধ্যেও এই ইস্যুতে মতভেদ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যদি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কোনও বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তা হলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।
অন্য দিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, পাকিস্তান এক ধরনের ‘দ্বৈত কৌশল’ নেওয়ার চেষ্টা করছে—এক দিকে আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্য দিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান ধরে রাখা। কিন্তু এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়।
সব মিলিয়ে, ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা যতটা, তার চেয়ে বেশি এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের ভিতরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক কৌশলের উপর। তবে একটাই স্পষ্ট—এই সংকট সহজে মেটার নয়।