বাংলায় বাড়ছে ‘ষষ্ঠীর ভান্ডার’!
এক সময় বলা হত, বার্ধক্যের শহর বারাণসী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টাচ্ছে ছবি। এখন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে— একদিন হয়তো সেই তকমা পেতে পারে কলকাতা নিজেই।
কারণ, শহরে জন্মহার দ্রুত কমছে। এতটাই কম যে, জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য যেখানে প্রজনন হার ২.১ হওয়া দরকার, সেখানে কলকাতায় তা নেমে এসেছে ১-এরও নীচে। গবেষকদের মতে, বাস্তবে এই হার প্রায় ০.৮— যা কার্যত বিপজ্জনক স্তর। অর্থাৎ, নতুন প্রজন্মের সংখ্যা কমছে, আর বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত।
এর প্রভাব শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গভীর। আগামী দিনে শিল্প বা বড় সংস্থা যদি শহরে বিনিয়োগ করতে চায়, তখন পর্যাপ্ত কর্মীই পাওয়া যাবে না— এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তখন হয়তো অন্য রাজ্য থেকে শ্রমশক্তি আমদানি করতে হতে পারে।
তবু আশ্চর্যের বিষয়, এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে খুব একটা আলোচনা নেই। জনঘনত্ব বেশি— এই যুক্তি দেখিয়ে অনেকেই বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে সাময়িক সুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যাই বাড়বে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পেনশনের উপর চাপ বাড়বে বহুগুণ।
সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। উচ্চশিক্ষিত নারী, দেরিতে বিয়ে, ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার দেওয়া— এগুলো এখন শহুরে জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার খরচ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা। ফলে অনেক দম্পতি সচেতন ভাবেই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বিশেষ করে ‘ডুয়াল ইনকাম, নো কিডস’— এই ধারণা এখন শহরে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, সন্তান লালন-পালন শুধু আবেগের বিষয় নয়, বড় আর্থিক দায়ও। শিক্ষা, স্বাস্থ্য— সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ছে। তাই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ভ্রমণ বা পেশাগত উন্নতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকেই।
তবে সামাজিক চাপ পুরোপুরি কমেনি। পরিবার বা আত্মীয়দের তরফে এখনও সন্তান নেওয়ার জন্য চাপ থাকে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের একাংশ সেই চাপের বাইরে নিজেদের মতো জীবন বেছে নিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, ভবিষ্যতে প্রয়োজনে সহায়ক রাখবেন বা বৃদ্ধাশ্রমের পথ বেছে নেবেন।
এই প্রবণতা শুধু শহরে নয়, গ্রামাঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম ও শহর— দু’ক্ষেত্রেই প্রজনন হার জাতীয় গড়ের নিচে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাঙালির জনসংখ্যাও কমে যেতে পারে— এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বজুড়েই এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ইউরোপ, জাপান, সিঙ্গাপুর— বহু দেশ জন্মহার বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। নগদ অনুদান, কর ছাড়, পেরেন্টাল লিভ— নানা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ভারতে আন্ধ্রপ্রদেশ-এর মতো কিছু রাজ্যও ইতিমধ্যে পদক্ষেপ শুরু করেছে।
বাংলায় এখনও তেমন বড় কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। আজ যেখানে লক্ষ্মীর ভান্ডার বা ‘অন্নপূর্ণা’-র মতো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে, সেখানে ভবিষ্যতে হয়তো আরও জরুরি হয়ে উঠবে সন্তান জন্মে উৎসাহ দেওয়ার নীতি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— যদি সন্তানই না থাকে, তবে ভবিষ্যতের সমাজ দাঁড়াবে কী ভাবে? হয়তো সেই দিন খুব দূরে নয়, যখন বাংলাকে সত্যিই ফিরে তাকাতে হবে মা ষষ্ঠীর দিকেই।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?