পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল নজির!
পশ্চিমবঙ্গে ভোট মানেই দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা, অভিযোগ আর অশান্তির স্মৃতি। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সেই পরিচিত ছবিটাকেই যেন ভেঙে দিল। বহু বছর পর রাজ্য দেখল এমন এক ভোট, যাকে অনেকেই নির্দ্বিধায় “অবাধ ও শান্তিপূর্ণ” বলছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ দশকে এই ধরনের নির্বাচন হাতে গোনা—১৯৭১, ২০১১ এবং এখন ২০২৬। অর্থাৎ প্রায় ১৪টি বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তৃতীয় বার এমন অভিজ্ঞতা হল রাজ্যবাসীর।
এই বদলের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে। শুরু থেকেই তারা “ভয়ভীতিহীন ভোট” করানোর বার্তা দেয়। তার ফলও মিলেছে হাতে-নাতে—দুই দফাতেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশের উপরে। শুধু তাই নয়, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভোটের দিন তো দূরের কথা, পুরো প্রচারপর্ব জুড়েই কোনও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। সাম্প্রতিক অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট—২০২১ সালে যেখানে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, ২০১৬-তে ৭ জন, সেখানে এ বার সেই সংখ্যা শূন্য।
বোমাবাজি বা বড়সড় হিংসার ঘটনাও কার্যত দেখা যায়নি। যা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একেবারেই বিরল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে ছিল কমিশনের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। ভোট ঘোষণার আগেই প্রশাসনিক স্তরে একাধিক বদল, পুলিশ ব্যবস্থায় রদবদল, পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকা—সব মিলিয়ে গোটা ব্যবস্থাকেই নতুন করে সাজানো হয়েছিল। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ অগ্রবাল, বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এবং বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক এন কে মিশ্র—এই তিন আধিকারিকের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছেন অনেকেই।
তাঁদের কৌশল ছিল রাজনৈতিক দলগুলিকে সরাসরি টার্গেট না করে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনা। অর্থাৎ, ভোটের পরিবেশ এমন রাখা যাতে কোনও পক্ষই সহজে অনিয়ম করার সুযোগ না পায়। এই পদ্ধতিই কার্যকর হয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের একাংশের।
তবে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ইতিহাস একেবারেই সরল নয়। ১৯৭২ সালের নির্বাচনকে বহু মানুষ এখনও “সবচেয়ে কালো অধ্যায়” হিসেবে মনে করেন। সেই সময় ‘রিগিং’ শব্দটি রাজনৈতিক অভিধানে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের পরাজয়, ৩৪ বছরের বাম শাসনের সূচনা—সব কিছুর পেছনেই সেই সময়কার ভোট নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
আবার অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের ভোটে ব্যাপক জনঅংশগ্রহণ থাকলেও কিছু হিংসার ঘটনাও ঘটেছিল। ফলে সেটিকেও পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ বলা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের নির্বাচন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে—কারণ এখানে অংশগ্রহণ যেমন বেশি, তেমনই হিংসা কার্যত শূন্য।
রাজনৈতিক মহলেও এই ভোট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শাসক-বিরোধী—উভয় পক্ষই কমিশনের ভূমিকা স্বীকার করেছে। অনেকের মতে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি এবং কঠোর নজরদারি ভোটকে স্বচ্ছ রাখতে সাহায্য করেছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলিও তুলনামূলক সংযত ছিল।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকতেই পারে। দীর্ঘদিনের অভিযোগ-আশঙ্কার আবহ কাটিয়ে এই ভোট দেখাল—সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব। এখন দেখার, ভবিষ্যতেও এই ধারা বজায় থাকে কি না।