ইরান সংঘাতে নীরব খেলোয়াড় বেজিং!
পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, ততই কৌশলে লাভ তুলছে চিন। প্রকাশ্যে কূটনৈতিক ভাষায় শান্তির ডাক দিলেও আড়ালে বেজিংয়ের ভূমিকা অনেকটাই আলাদা— এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক তথ্যের নাগাল পাওয়ার সুযোগ— এই দুই দিক থেকেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে চিন।
ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ অভিযানের পরে তেহরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে চিনের বিদেশ মন্ত্রক উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তারা বলেছিল, এই হামলা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। সংঘর্ষ বন্ধ করে দ্রুত শান্তি ফেরানোর আহ্বানও জানিয়েছিল বেজিং। তবে কূটনৈতিক বিবৃতির আড়ালে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে চিন— এমন অভিযোগ বহু দিন ধরেই রয়েছে।
এই সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২৫ বছরের একটি সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে। সেই চুক্তির আওতায় ইরানকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের সুবিধা দিয়েছে চিন। এর ফলে ইরানের হামলার ক্ষমতা এবং নজরদারি শক্তি দুটোই অনেকটাই বেড়েছে।
২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে ইরানের সঙ্গে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন’ বা জেসিপিওএ নামে একটি পরমাণু চুক্তি হয়েছিল। তাতে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি, চিন এবং আমেরিকা— এই ছয় শক্তিধর দেশ অংশ নেয়। শর্ত ছিল, ইরান যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি সীমিত করে, তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে।
কিন্তু এই চুক্তির একটি বড় ফাঁক ছিল— ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি তেমন গুরুত্ব পায়নি। সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় তেহরান। আর সেই ক্ষেত্রেই সহায়ক হয়ে ওঠে চিন। যখন আন্তর্জাতিক মহল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে নজর দিচ্ছিল, তখন বেজিং নীরবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নত করতে সহায়তা করছিল বলে অভিযোগ।
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন। পরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানায়, ইরান আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। এর পর থেকেই পশ্চিমি বিশ্ব আরও সতর্ক হয়ে ওঠে।
বর্তমান সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতার পেছনে চিনা প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে বেইডু নামে চিনের স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা ইরানের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি মূলত মার্কিন জিপিএস ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ৩০টি উপগ্রহের মাধ্যমে কাজ করা এই প্রযুক্তি ড্রোন পরিচালনা, ক্ষেপণাস্ত্র নির্দেশনা এবং নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিপিএস জ্যামিংয়ের অভিজ্ঞতার পরে ইরান ধীরে ধীরে চিনা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকেছে। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে পারছে তারা।
শুধু প্রযুক্তি নয়, সামরিক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এই সংঘাত চিনের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। ইরানের মাধ্যমে মার্কিন সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধকৌশল, অস্ত্রব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছে বেজিং— এমন আশঙ্কা রয়েছে। ভবিষ্যতে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতে এই তথ্য কাজে লাগতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়াও, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে সাহায্য করছে চিন। অনেক ক্ষেত্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তির পিছনেও চৈনিক সহযোগিতার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক লড়াই নয়— এর আড়ালে চলছে বৃহৎ শক্তিগুলির কৌশলগত প্রতিযোগিতাও। আর সেই খেলায় প্রকাশ্যে না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ চাল চালছে বেজিং। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই হয়তো এই নীরব কৌশলের সুফল পেতে পারে চিন।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?