কলকাতা মেট্রোর পুরনো পথের নতুন সমস্যার গল্প
কলকাতার প্রাচীনতম মেট্রোপথ ব্লু লাইন একসময় ছিল শহরের যাত্রী চলাচলের নীল রক্তধারী। দক্ষিণেশ্বর থেকে কবি সুভাষ পর্যন্ত এই লাইন চলত একনিষ্ঠভাবে, প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি এসপ্ল্যানেড-শিয়ালদহ এবং নোয়াপাড়া-বিমানবন্দর লাইন চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। ব্লু লাইন এখন দুয়োরানি—একদিকে পুরনো পথে ভিড় ঠাসা, অন্যদিকে নতুন লাইনের চাপ।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেলগাছিয়ার বাসিন্দা দীপ্তি মৈত্রের অভিজ্ঞতা চোখে পড়ে। চাঁদনি চক থেকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি পরপর আটটি ট্রেন মিস করেন। ৭টা ৫৮ মিনিটে যে ট্রেনে উঠেন, সেটিও শোভাবাজার স্টেশনে ১৩ মিনিট আটকে থাকে। দরজা বন্ধ করতে না পারায় যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। নির্ধারিত ১৩ মিনিটের যাত্রা হয় ৩৭ মিনিটে। ভিড়ের চাপ এবং ট্রেনের অনিয়মে যাত্রীরা ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ।
শুক্রবার সকালে শহিদ ক্ষুদিরাম থেকে সেন্ট্রাল যাওয়ার পথে পাটুলির বাসিন্দা নিমাই সেনও একই সমস্যার মুখোমুখি হন। ১১টা ৪০ মিনিটে আসার কথা ট্রেন ১৯ মিনিট দেরিতে আসে। কোনো ঘোষণা ছিল না। এই অনিশ্চয়তায় যাত্রীদের দুশ্চিন্তা বাড়ে। দুপুরে দমদম থেকে রবীন্দ্র সদনের অফিসে যাচ্ছিলেন তূর্ণা রায়চৌধুরী। ট্রেন আসায় দেরি, ভিড় এবং এসি খারাপ থাকায় তিনি ধাক্কা খেয়ে উঠতে বাধ্য হন।
কেন ব্লু লাইনের এই অবস্থা? সম্প্রতি গ্রিন, ইয়েলো এবং অরেঞ্জ লাইন চালু হওয়ার পর ব্লু লাইনের সঙ্গে নতুন লাইনগুলো মিশেছে। ফলে ভিড় বেড়েছে। প্রতি দিন গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ ব্লু লাইনে যাতায়াত করছেন। নতুন লাইনের রেক প্রায় সবই ইয়েলো এবং গ্রিন লাইনে ব্যবহার হচ্ছে। ব্লু লাইনে পর্যাপ্ত রেক নেই, ফলে সময়সূচি বিঘ্নিত হচ্ছে। কবি সুভাষ স্টেশনেও সমস্যা। ব্লু লাইন দক্ষিণেশ্বর থেকে শহিদ ক্ষুদিরাম পর্যন্ত চলছে। ফাঁকা রেক নিয়ে শহিদ ক্ষুদিরাম পর্যন্ত যাত্রী নিলে সময় কমে না।
যাত্রী অভিযোগ অনুযায়ী, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে না, মেট্রো সময়মতো চলে না, এসি প্রায় সব রেকে খারাপ, দরজা বন্ধ হয় না। নাগেরবাজারের বাসিন্দা রথীকান্ত সেনগুপ্ত বলেন, “আগে সময়ানুবর্তিতা ছিল। এখন এসি-ডোর সমস্যা, ভিড়ের চাপ—সব মিলিয়ে যাত্রা দুশ্চিন্তা হয়ে গেছে।” তবে দত্তপুকুরের মল্লিকা দত্ত মনে করেন, “ভাড়া কম, তাই কিছুটা ভিড় হলেও কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিতে পারেন না।”
মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, ব্লু লাইনে ২৮৪টি পরিষেবা চলছে। যেকোনো সমস্যায় কর্মীরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বলে, ভিড় সামলানো যথেষ্ট কঠিন। নতুন লাইনের উদ্বোধন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের তোড়জোড়—সব মিলিয়ে ব্লু লাইনও ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে।
মেট্রোর আয় বেড়েছে। তবে ব্লু লাইনে পরিষেবা নতুন লাইনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী, ভিড়, প্রযুক্তিগত ত্রুটি—সব মিলিয়ে শহরের প্রাচীন নীল রক্তধারী আজ দুয়োরানি হয়ে গেছে। নতুন লাইনের ঝলক থাকলেও পুরনো ব্লু লাইনের যাত্রী এখনই উপযুক্ত পরিষেবা পাচ্ছেন না।