অভিযুক্তের বান্ধবী হয়েই অপমান!!
কসবার সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ‘এম’-এর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এক তরুণীর। সেই সম্পর্ক আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজমাধ্যমে সেই তরুণীর নাম ও ছবি ঘুরতে শুরু করার পর থেকে একের পর এক কটূক্তি, অশালীন মন্তব্য, এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়েছেন তিনি। অথচ, এই ঘটনায় তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র নেই। শুধু অভিযুক্তের প্রেমিকা হওয়ার পরিচয়টুকু তাঁকে সমাজমাধ্যমে এক নির্মম ট্রোলিং-এর শিকার করেছে।
২০১৮ সাল থেকে প্রেমিক ‘এম’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তাঁর। একসময় সেই সম্পর্ক ছিল সমাজমাধ্যমে খোলামেলা। সেইসব ছবি, স্মৃতিময় পোস্ট এখন হয়ে উঠেছে নিন্দার অস্ত্র। ২৬ জুন অভিযুক্ত ‘এম’-এর গ্রেফতারির পর, তাঁর সঙ্গে থাকা পুরনো ছবিগুলোর নিচে জড়ো হয়েছে অজস্র অপমান। কেউ তাঁকে দোষারোপ করছেন ধর্ষকের সঙ্গিনী হওয়ার জন্য, কেউ সরাসরি তাঁকেই সমান দোষী সাব্যস্ত করছেন। চাপাচাপির জেরে অবশেষে তরুণী নিজের প্রোফাইল ‘লক’ করে দেন, কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে।
শুক্রবার আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তরুণী বলেন, “আর সহ্য করতে পারছি না। এই ট্রমা আমার পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে উঠেছে।” তিনি জানান, চেনা-অচেনা অনেকেই শুধু তাঁর ছবি ব্যবহার করে তাঁকে অপমান করছেন। তাঁর কথায়, “আমি কি শুধু এই কারণে দোষী, যে আমার প্রেমিক একটি জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত? যে ঘটনার সঙ্গে আমি কোনও ভাবেই জড়িত নই, সেই অপরাধের দায়ভার কেন আমাকে নিতে হবে?”
আইনের ছাত্রা এবং বর্তমানে একজন আইনজীবী হিসেবেও কাজ করা এই তরুণী কেবল মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নন, পেশাগত ভাবেও উদ্বিগ্ন। তাঁর আশঙ্কা, এই অপমানজনক সামাজিক লাঞ্ছনা তাঁর কেরিয়ারে ছায়া ফেলতে পারে। “যাঁরা আমার ছবি পোস্ট করছেন, তাঁরা কি একবারও ভেবে দেখছেন, এটার কী প্রভাব হতে পারে? তাঁদের মনে কি একটুও সহানুভূতি নেই?”— প্রশ্ন তাঁর।
‘এম’-এর গ্রেফতারির পরপরই তরুণী তাঁর প্রোফাইল থেকে ‘এম’-এর নাম সরিয়ে দেন। কিন্তু এর মধ্যেই অনেকেই তাঁদের যৌথ ছবি সংগ্রহ করে তা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর অনুমতি ছাড়াই এমন অনধিকার প্রবেশে তিনি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। “আমার ছবির নিচে যে ভাষায় মন্তব্য হচ্ছে, তা নারকীয়,” বলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, কসবার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ছাড়াও আরও দু’জন অভিযুক্ত এবং এক নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ জুন সন্ধ্যায় নির্যাতিতাকে প্রথমে কলেজের ইউনিয়ন রুমে, পরে রক্ষীর ঘরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ সাত ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং ঘটনার পুনর্নির্মাণও করা হয়েছে।
এই নির্মম ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবি সর্বত্র উঠেছে। তবে অভিযুক্তের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা মাত্রেই একটি নিরপরাধ তরুণীকে এমনভাবে হেনস্থা করা—একটি বড় সামাজিক প্রশ্ন। তাঁর প্রশ্ন, “এক নারীকে ন্যায় দিতে গিয়ে আরেক নারীকে সমাজের রোষানলে ফেলে দেওয়া—এই কি আমাদের ন্যায়বোধ?”