কালীঘাটের কাকু!
পশ্চিমবঙ্গের চাকরি দুর্নীতি কাণ্ডে প্রতিদিনই উঠে আসছে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য। এবার জানা গেল, শুধু অডিয়ো রেকর্ড নয়, ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিয়োও ছিল, যা মুছে ফেলার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন ‘কালীঘাটের কাকু’ ওরফে সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র। সিবিআই-এর চার্জশিটে উঠে এসেছে এমনই বিস্ফোরক তথ্য।
ভিডিয়ো রেকর্ড ও মুছে ফেলার অনুরোধ
সিবিআই-এর তদন্তে উঠে এসেছে, চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে কীভাবে ঘুষের টাকা লেনদেন করা হতো, তা মোবাইল ক্যামেরায় রেকর্ড করেছিলেন এক এজেন্ট। সেই ভিডিয়ো হাতে পাওয়ার আগেই অবশ্য তা মুছে ফেলা হয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই ঘুষ কেলেঙ্কারিতে সুজয়কৃষ্ণের প্রধান সহযোগী নিখিল হাতিও যুক্ত ছিলেন। অভিযোগ, এক এজেন্ট তাঁর ফোনে নিখিল হাতির ঘুষ নেওয়ার মুহূর্তটি রেকর্ড করেছিলেন, যেখানে সুজয়কৃষ্ণ নিজেও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু পরে সুজয়কৃষ্ণ নিজেই সেই এজেন্টকে একাধিকবার ফোন করে ভিডিয়োটি মুছে ফেলার জন্য অনুরোধ করেন।
ফোন পানিতে, তথ্য মুছে দেওয়ার চেষ্টা
সিবিআই চার্জশিটে দাবি করেছে, শুধু ফোনে অনুরোধ নয়, সমস্ত প্রমাণ লোপাট করতেই সুজয়কৃষ্ণ নিজের দুটি মোবাইল ফোন কালীঘাটের আদিগঙ্গায় ফেলে দিয়েছিলেন। এমনকি, ঘুষ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তিনি নিজে হাতে মুছে দেন বলে সিবিআইকে জানিয়েছেন ওই সাক্ষী। হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে সুজয়কৃষ্ণ তাঁর এজেন্টদের নির্দেশ দেন সমস্ত রেকর্ড মুছে ফেলার জন্য।
৭৮ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ
সিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে, এই নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে প্রায় ৭৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। চার জন সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করেছে তদন্তকারী সংস্থা, যাঁরা প্রত্যেকেই অরুণ হাজরার এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। এই এজেন্টদের মাধ্যমেই চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে তা পৌঁছে দেওয়া হত সুজয়কৃষ্ণের হাতে।
সাক্ষীদের বয়ান অনুযায়ী, এজেন্টদের কাছে বেশ কয়েকটি ডায়েরি ছিল, যেখানে লেখা ছিল কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে এবং কাদের চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। যদিও সুজয়কৃষ্ণ দাবি করেছিলেন, তিনি ১৭ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছেন, কিন্তু বাকি টাকা আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
ফেলো কড়ি, চাকরি কই?
সিবিআই সূত্রের দাবি, এই দুর্নীতি চক্রের মাধ্যমে প্রায় ৪০ কোটি টাকার বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু আরও অনেক চাকরিপ্রার্থী, যারা টাকা দিয়েছিলেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত চাকরি পাননি। যখন তাঁরা টাকা ফেরত চাইতে যান, তখন তাঁদের ভয় দেখানো হয়। এমনকি, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
তদন্তে আরও বড় নাম জড়ানোর আশঙ্কা
সিবিআইয়ের তৃতীয় চার্জশিটে আরও বিস্ফোরক তথ্য উঠে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই কেলেঙ্কারির তদন্তে তৃণমূল নেতা কুন্তল ঘোষ, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এমনকি, কথোপকথনের প্রতিলিপিতে রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের নামও শোনা গিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
শেষ কথা
এই দুর্নীতি মামলায় প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই ও ইডি একের পর এক তথ্য সংগ্রহ করছে, যা কেলেঙ্কারির চিত্র আরও স্পষ্ট করে তুলছে। প্রশ্ন উঠছে, এই বিশাল অর্থ কোথায় গেল? কারা এর আসল সুবিধাভোগী? তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসবে।