বাবরের ভিটের খনিজ ভান্ডার
উজবেকিস্তান, এক সময়ের মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের জন্মভূমি, এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারণ? দেশটির মাটির তলায় লুকিয়ে থাকা জটিল খনিজ (ক্রিটিক্যাল মিনারেল) এবং বিরল ভূ উপাদানের (রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস) বিপুল ভান্ডার। এই খনিজ সম্পদ নিয়ে কূটনৈতিক কৌশল সাজিয়ে তাসখন্দের সঙ্গে চুক্তি করছে আমেরিকা। একই সময়ে ভারতও এই দৌড়ে রয়েছে, তবে কি তা যথেষ্ট?
কেন উজবেকিস্তান এত গুরুত্বপূর্ণ?
উজবেকিস্তানের খনিজ ভান্ডার শুধু মধ্য এশিয়ায় নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এবং শক্তি ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম। জার্মেনিয়াম, সিলিকন, ইউরেনিয়াম, রেনিয়াম এবং টেলুরিয়ামের মতো দুর্মূল্য খনিজের জন্য দেশটি পরিচিত। ২০১৮ সালে প্রকাশিত আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক বিভাগের একটি রিপোর্ট জানায়, উজবেকিস্তানের মাটির নীচে বিপুল পরিমাণ তামা, মলিবডেনাম, এবং ক্যাডমিয়ামের মতো খনিজ লুকিয়ে রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সবুজ শক্তি এবং ডিজিটাল রূপান্তর যত বাড়ছে, ততই এই খনিজগুলির চাহিদা বাড়ছে। ইলেকট্রিক গাড়ি, সোলার প্যানেল এবং উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি তৈরিতে এই খনিজ অপরিহার্য।

আমেরিকার কৌশল: উজবেকিস্তানের খনিজ কব্জা করার চেষ্টা
২০২৪ সালে আমেরিকা এবং উজবেকিস্তানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উজবেক ভূতাত্ত্বিক মন্ত্রকের সঙ্গে এই চুক্তির লক্ষ্য, খনিজ উত্তোলন এবং প্রাকৃতিক গ্যাস পরিকাঠামো উন্নয়ন। আমেরিকার মতে, এই চুক্তি বিশ্বের খনিজ সরবরাহে শৃঙ্খলা এবং বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি উজবেকিস্তানের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করবে।
এছাড়া, আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ‘খনিজ সুরক্ষা অংশীদার’ (মিনারেল সিকিউরিটি পার্টনারশিপ) সংগঠনের সদস্য উজবেকিস্তান। এই সংস্থার মূল লক্ষ্য জটিল খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা মজবুত করা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, আমেরিকা যদি উজবেকিস্তানের খনিজ সম্পদের দখল নিতে সক্ষম হয়, তবে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্যও লাভজনক হবে।
ভারতের সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ
মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম কারণ ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, বিশেষত পাকিস্তানের কারণে। তবে বর্তমানে ইরানের চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে উজবেকিস্তান এবং অন্যান্য মধ্য এশিয়ার দেশে ভারতের পণ্য রপ্তানি সহজ হয়েছে।
ভারত এবং উজবেকিস্তান দু’টি দেশই সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সদস্য। এই সংস্থার মাধ্যমে ভারত উজবেকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি, উজবেকিস্তানের খনিজ সম্পদ আমদানির দিকে নজর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
উজবেকিস্তানের ওপর অন্য শক্তিগুলির প্রভাব
উজবেকিস্তানের উপর চীনের প্রভাব বাড়ছে, যা আমেরিকার জন্য বড় বাধা। বিগত কয়েক বছরে চীন তাসখন্দের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। এছাড়াও, রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখনও উজবেকিস্তানে বর্তমান। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটি স্বাধীন হলেও, রুশ প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
ভারতের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
উজবেকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে গভীর। বাবর থেকে শুরু করে বর্তমান কূটনীতি, দুই দেশের মধ্যে সংযোগের সেতু দীর্ঘ। তবে, খনিজের বাজারে আমেরিকা এবং চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিযোগীদের সঙ্গে টক্কর দিতে হলে ভারতের কৌশল আরও কার্যকর এবং গতিশীল করতে হবে।
চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়িয়ে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার দিকে জোর দেওয়া উচিত। পাশাপাশি, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে।
উপসংহার
উজবেকিস্তানের খনিজ সম্পদ নিয়ে আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়ার মধ্যে চলা প্রতিযোগিতা বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। তবে ভারতের জন্য এটি এক বড় সুযোগ। ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে ভারত যদি কৌশলগতভাবে এগোয়, তবে এই প্রতিযোগিতা থেকে লাভবান হওয়া সম্ভব।
উজবেকিস্তানের মাটির তলায় লুকিয়ে থাকা এই খনিজ ভান্ডার শুধু এক দেশের নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এবং রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিযোগিতার দৌড়ে কারা এগিয়ে থাকে।
কুম্ভমেলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ছড়াল আতঙ্ক, পুড়ল একাধিক তাঁবু