হাসির আড়ালে গুরুগম্ভীর শিল্প: জহর রায়ের জন্মশতবর্ষে এক স্মৃতিচারণ

জহর রায়ের জন্মশতবর্ষে এক স্মৃতিচারণ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে যদি কৌতুকাভিনয়ের তিনটি নাম উচ্চারণ করতে হয়, তবে নিঃসন্দেহে সেই তালিকায় থাকবেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী এবং জহর রায়। আজও তাঁর নাম…

September 19, 2025
1 min read

জহর রায়ের জন্মশতবর্ষে এক স্মৃতিচারণ

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে যদি কৌতুকাভিনয়ের তিনটি নাম উচ্চারণ করতে হয়, তবে নিঃসন্দেহে সেই তালিকায় থাকবেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী এবং জহর রায়। আজও তাঁর নাম শুনলেই দর্শকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক রোগা-পাতলা, কৌতুকমিশ্রিত মুখ, যিনি মঞ্চে বা পর্দায় আসামাত্রই ভিড় ফেটে পড়ত হাসিতে। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর শিল্পবোধ আর জীবন-যুদ্ধের গল্প।

১৯১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বরিশালে জন্ম জহরের। ছোটবেলায় কলকাতা, পরে বাবার সঙ্গে পাটনায় গিয়ে পড়াশোনা। সেখান থেকেই ম্যাট্রিক পাশ ও কলেজের পাঠ শুরু। কিন্তু নিয়মিত জীবনের বাঁধনে তাঁকে টেনে নেয় নানান পেশা— কখনও প্রুফ রিডার, কখনও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি, আবার দর্জির দোকানের মালিক। দাঙ্গায় দোকান ভস্মীভূত হওয়ার পরই অভিনয়কে পেশা করার সিদ্ধান্ত নেন।

সুযোগ আসে ১৯৪৭ সালে অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পূর্বরাগ ছবিতে। যদিও দর্শকের চোখে ধরা দেন ১৯৫২ সালের বসু পরিবার ছবিতে, এক সুদখোর পাওনাদারের ভূমিকায়। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ৩০০-রও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।

জহরের অভিনয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর নির্লিপ্ত মুখভঙ্গি আর কণ্ঠস্বরের অনন্য ওঠানামা। সেই স্বকীয়তা তাঁকে বানিয়েছে দর্শকদের প্রিয়। গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবিতে নধর মন্ত্রীর ভূমিকায় তাঁর সংলাপ উচ্চারণ কিংবা ধন্যি মেয়ে ছবিতে জমিদার গোবর্ধন চৌধুরীর ক্ষণেক্ষণেক অভিব্যক্তি বদলের অভিনয় আজও দর্শক ভুলতে পারেনি।

তবে সিনেমার পাশাপাশি মঞ্চেও সমান জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৫৫ সালে রঙমহলে দূরভাষিণী নাটক দিয়ে যাত্রা শুরু। পরবর্তী কালে শেষ লগ্ন, সাহেব বিবি গোলাম, বাবা বদল থেকে শুরু করে উল্কা— একের পর এক নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। বেতার নাটক ও কৌতুক-নকশাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল জহরের কাছে এক অন্যরকম বিস্ময়। পরশ পাথর-এ ছোট একটি চরিত্রে এবং পরে গুপী গাইন বাঘা বাইন-এ বড় ভূমিকা। নিজেই বলেছিলেন, “সত্যজিতের ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝেছিলাম, আমি এতটা পারি, সেটা আমিই জানতাম না।”

তবে ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সরল, কিছুটা অগোছালোও। আর্থিক দিক নিয়ে কখনও মাথা ঘামাতেন না। যেটুকু পারিশ্রমিক পাওয়া যেত, তাতেই খুশি থাকতেন। ভানুর মতো বেছে কাজ না করলেও, দর্শকদের আনন্দ দেওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।

মদ্যপানের অভিযোগ তাঁর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল। যদিও কতটা সত্য, তার সঠিক প্রমাণ নেই। তবে এই অভ্যাসই তাঁর শরীর ভেঙে দেওয়ার কারণ হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। ১৯৭৭ সালের ১ অগস্ট মাত্র ৫৭ বছর বয়সে হাসপাতালের শয্যায় তাঁর জীবনাবসান হয়। সহঅভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ভেঙে পড়েছিলেন। সুচিত্রা সেন কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, “তুমি চলে গেলে চার্লি!”

নিজেকে ‘এ যুগের ভাঁড়’ বলে পরিচয় দিতে দ্বিধা করতেন না জহর রায়। তাঁর কাছে দর্শকের মুখের হাসিই ছিল সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সেই হাসি আর আনন্দ দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন বাঙালির হৃদয়ে। জন্মশতবর্ষে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তিনি শুধু কৌতুকাভিনেতা নন, ছিলেন এক পূর্ণাঙ্গ শিল্পী— যিনি হাসির আড়ালে সমাজের তীব্র বৈষম্য ও বেদনা ফুটিয়ে তুলেছিলেন নিখুঁত অভিনয়ে।

আজও তাই দর্শক মনে মনে বলেন— “শালা জহর আসছে”— আর হাসির সঙ্গে ভেসে আসে এক গভীর শ্রদ্ধার স্রোত।

ওড়িশায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে ইডির তল্লাশি, ১৩৯৬ কোটির প্রতারণা মামলায় উদ্ধার কোটি টাকার সম্পদ

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *