সোমা বলছি!
“আমি সোমা বলছি…”— এক অজানা নারীকণ্ঠে ভেসে আসা এই লাইনটা গত বছর হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মোবাইলে। ভয়, রাগ, বিস্ময়— সব মিলিয়ে নড়ে উঠেছিল গোটা রাজ্য। এক চিকিৎসক-ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার ঘূর্ণিতে শোকবিহ্বল বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই ‘অডিয়ো ক্লিপ’, যেখানে এক নারী নিজেকে ‘সোমা মুখার্জি’ নামে পরিচয় দিয়ে দাবি করেছিলেন, তিনি আরজি কর হাসপাতালেরই কেউ।
তবে কে এই সোমা? এক বছর পরেও সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। আনন্দবাজার অনলাইনের পক্ষ থেকে আন্দোলন-সম্পৃক্ত অনেকের সঙ্গেই কথা বলা হয়— সকলেই জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা ‘সোমা’কে চেনেন না। কেউ কেউ ক্লিপটি শুনলেও, একে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ বলছেন, এটা ছিল অতিভক্তির প্রকাশ— এক ধরনের বিপজ্জনক উগ্র আবেগ, যা আন্দোলনকেই ভ্রষ্ট করেছিল।
তবুও, এই গুজবের হাত ধরে শয়ে শয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল কি না, সে প্রশ্নও উড়িয়ে দেননি আন্দোলনের অন্যতম আহ্বায়ক রিমঝিম সিংহ। তাঁর মতে, হ্যাঁ, কিছু মানুষ গুজবে টান খেয়েছিলেন, কিন্তু মূলত রাস্তায় নেমেছিলেন রাজশক্তির অন্যায়ের প্রতিবাদেই।
কিন্তু সোমার ‘অডিয়ো’ ছিল শুধু শুরু। এরপর একের পর এক চমকপ্রদ, ভয়াবহ দাবি ঘুরতে থাকে হোয়াটসঅ্যাপে— যেমন, ‘১৫০ গ্রাম বীর্য’ মেলার গুজব! প্রবীণ এক চিকিৎসক সংবাদমাধ্যমে এই তথ্য পেশ করলেও, অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা সঙ্গে সঙ্গে তা নস্যাৎ করেন— বলেই দেন, এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের চোখে অসম্ভব এবং অবৈজ্ঞানিক।
আরও গুজব— ‘ষড়যন্ত্রী’ ছয় চিকিৎসকের নাম, যাঁরা নাকি ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন। অনেকের ছবি, পরিচয় ছড়ানো হয়। বলা হয়, তাঁরা পলাতক। অথচ পরে দেখা যায়, কেউ হস্টেলে, কেউ বাড়িতে, কেউ আন্দোলনেই অংশ নিচ্ছেন। এসব গুজবে শুধু সংশ্লিষ্টরা নয়, তাঁদের পরিবারও চূড়ান্ত মানসিক চাপে পড়েছিলেন।
আবার ছড়ায়, ঘটনাস্থল অ্যাসিড দিয়ে ধুয়ে প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে। একজন নিরপরাধ ইন্টার্নকে রাজনৈতিক নেতার সন্তান বলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, শুধু পদবী মিলে যাওয়ার ভিত্তিতে।
এইসব গুজবের উৎস কোথায়? তৃণমূল বলে— এটা আন্দোলনের ভিত নড়াতে ছড়ানো হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা বলেন, গুজব ছড়িয়ে আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল সরকারপক্ষই। কারো নাম স্পষ্ট না করলেও, অনেকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিকল্পিত ভাবেই এগুলো রটানো হয়।
রাজনীতি কি গুজবের আশ্রয় নেয়নি আগে? নন্দীগ্রাম, জ্ঞানেশ্বরী থেকে শুরু করে বহু ঘটনার উদাহরণ টেনে সিপিএম এবং কংগ্রেসও শাসকদলকে আক্রমণ করেছে। ইতিহাসবিদ নির্বেদ রায়ের ভাষায়, গুজব ভারতীয় রাজনীতির চিরচেনা হাতিয়ার। কিন্তু মহৎ রাজনীতি কখনও তার সঙ্গ নেয় না— তার প্রমাণ আকবর কিংবা অশোক।
এক বছরের মাথায় ফিরে তাকালে স্পষ্ট— সত্য-মিথ্যার সীমানা কোথায়, সেটা আর বোঝা যায় না। ‘সোমা বলছি’ দিয়ে শুরু হয়েছিল এক আবেগতাড়িত পথচলা। কিন্তু তথ্যের অভাব আর গুজবের ছায়ায় সেই আন্দোলন কি শেষমেশ পথভ্রষ্টই হয়নি?
মায়ের কঠোর আদেশ থেকে শুরু করে ছোট ছোট টাস্ক, কন্যা পলককে বড় করতে যা করেছেন শ্বেতা তিওয়ারি