সোনাগাছিতে কার্তিক পুজো
কলকাতার অন্যতম বিখ্যাত যৌনপল্লি সোনাগাছিতে কার্তিক পুজো একটি প্রচলিত ঐতিহ্য। বহু বছর ধরে এই পুজো ঘরোয়াভাবে যৌনকর্মীদের ঘরের ভিতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০২৪ সালের এই কার্তিক পুজোয় ঘটতে চলেছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। এবার প্রথমবারের মতো যৌনকর্মীদের সংগঠিত প্রচেষ্টায় কার্তিক পুজো উদযাপিত হবে বারোয়ারি আঙ্গিকে, যেখানে যৌনকর্মীদের সন্তানরাও বড় ভূমিকা পালন করছে।
নতুন উদ্যোগ: বারোয়ারি কার্তিক পুজো
প্রথাগতভাবে সোনাগাছির কার্তিক পুজো ঘরোয়া আবহেই পালন করা হতো। ঘরের কোণে আলো-আঁধারির মাঝে এই পুজোর আয়োজন হতো, যেখানে বাইরের কেউ প্রবেশ করত না। কিন্তু এবার যৌনকর্মীদের সন্তানদের সংগঠন ‘আমরা পদাতিক’ এর উদ্যোগে পুজো হবে খোলামেলা মণ্ডপে। সোনাগাছির শীতলা মন্দিরের পাশে একটি আলোকসজ্জিত মণ্ডপে কার্তিক ঠাকুরের প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত হবে।
শনিবার সন্ধ্যায় এই পুজোর উদ্বোধন করবেন স্থানীয় বিধায়ক এবং রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা। উদ্বোধনের পর রাতভর চলবে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শুধুমাত্র পুজোর আচার অনুষ্ঠানই নয়, এই উৎসব হবে আনন্দের, সংযোগের এবং ঐতিহ্য উদযাপনের একটি মঞ্চ।
কার্তিক পুজোর গুরুত্ব
বাংলার ঐতিহ্যে কার্তিক ঠাকুরের একাধিক রূপ রয়েছে। পুরাণ অনুসারে তিনি দেবসেনাপতি ও একজন বীর যোদ্ধা। তবে বাংলার সংস্কৃতিতে কার্তিক ঠাকুরকে দেখা হয় মূলত সন্তান হিসেবে। কার্তিক পুজোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য প্রজনন কামনা। এই বিশ্বাস অনুসারে সন্তান লাভের জন্য অনেকে কার্তিক ঠাকুরের পুজো করেন।
সোনাগাছির যৌনকর্মীদের জন্য কার্তিক হলেন ‘বাবু’, অর্থাৎ স্নেহশীল এক সত্তা। কার্তিকের পরনে ধুতি, গায়ে জমকালো চাদর, এবং সুগঠিত গোঁফ— যৌনকর্মীদের কাছে এই প্রতিমা একজন আদর্শিক পুরুষের রূপ ধারণ করে। এই ‘বাবু’ যেন তাদের জীবনে ভালবাসা ও আশ্রয়ের প্রতীক।
সমাজের প্রতি বার্তা
যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতি’র মুখপাত্র মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায় বলেন, কার্তিক পুজো শুধু ভাল গ্রাহক পাওয়ার কামনা নয়, বরং সামাজিক স্বীকৃতির একটি অংশ। কার্তিক ঠাকুরের মতো পতিত অবস্থায় কাউকে না রাখতে চাওয়ার যে বার্তা, সেটি যৌনকর্মীদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
আরেক প্রবীণ যৌনকর্মী শ্যামলী সাঁতরা মনে করেন, কার্তিক ঠাকুরের অবিবাহিত অবস্থাই যৌনকর্মীদের আকর্ষণ করে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাই অবিবাহিত বাবু আসুক জীবনে, যাঁকে স্বামী ভাবা যাবে। তাই কার্তিক আমাদের কাছে এত প্রিয়।’’
খেলনার রঙিন উৎসব
এবারের পুজোয় কার্তিক ঠাকুরকে শিশু রূপে দেখা হবে। মণ্ডপে থাকবে শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় খেলনা— ঘুড়ি, লাটাই, লাট্টু, ব্যাটারি চালিত গাড়ি এবং মাটির পুতুল। ‘আমরা পদাতিক’ এর তরুণ সদস্যরা এই খেলনাগুলি সংগ্রহ করছে। পুজোর থিম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে একটি আকর্ষণীয় স্লোগান:
‘বিজয়ার পরে, মামার ঘরে আবার এল কার্তিক। সোনাগাছিতে এ বার উদ্যোগে আমরা পদাতিক।’
রূপক অর্থে, উমা যদি বাংলার কন্যা হন, তবে কার্তিক বাংলার মামার বাড়িতে ফিরে আসছেন। এই রূপকথার মাধ্যমে যৌনকর্মীদের সন্তানরা তাদের জীবনের নানা রঙ প্রকাশ করতে চাইছে।
পুজোর সামাজিক গুরুত্ব
সোনাগাছির এই বারোয়ারি পুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সমাজের প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। যৌনকর্মীদের সন্তানরা নিজেদের জীবনের উৎসবকে জনসমক্ষে এনে প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা সমাজের অঙ্গ। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজের পক্ষে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্প্রদায়ের সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পুজো যৌনকর্মীদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার আলো নিয়ে আসতে পারে। সোনাগাছির এই উৎসব কেবল একটি পুজো নয়, বরং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।