সেদিনও মঙ্গলবার, আজও মঙ্গলবার! বালাকোট থেকে ‘অপারেশন সিঁদুর’
ছয় বছর আগে পুলওয়ামা হামলার জবাবে বালাকোটে ভারতীয় বায়ুসেনার প্রত্যাঘাত ঘটেছিল এক মঙ্গলবার ভোরে। আর ঠিক ছ’বছর পর, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ১৫ দিনের মাথায়, আর এক মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে ৯টি জঙ্গি ঘাঁটিতে ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক’ চালায় ভারত— নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। দুই অভিযানের মাঝে সময়, প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও এক বিস্ময়কর মিল রয়ে যায়— প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘নিস্পৃহ’ ২৪ ঘণ্টা।
২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোর ৩.৩০ মিনিটে ভারতীয় বায়ুসেনা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার বালাকোটে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটিতে ‘স্পাইস বোমা’ ফেলে হামলা চালিয়েছিল। পুলওয়ামা কাণ্ডে ৪০ জওয়ানের মৃত্যুর বদলা নিতে সময় নিয়েছিল ১২ দিন। সেই হামলায় প্রায় ৩৫০ জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এবং হামলার আগের দিন মোদী ছিলেন নিস্পৃহ। কুম্ভমেলায় পা ধুয়ে দিচ্ছেন সাফাইকর্মীদের, জাতীয় যুদ্ধ স্মারকের উদ্বোধন করছেন। কোনও ইঙ্গিত তখন মেলেনি আসন্ন অভিযানের।
২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আগেও মোদী ঠিক তেমনই ‘নিরুদ্বিগ্ন’। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে এবিপি নেটওয়ার্ক সামিটে অংশ নেন তিনি। কথা বলেন সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও পাকিস্তানের সঙ্গে জলচুক্তি স্থগিতের কারণ নিয়ে। সামান্য হাসিঠাট্টাও করেন, কিন্তু সামান্যতম ইঙ্গিতও দেননি পাকিস্তান সীমান্তে আসন্ন অভিযানের।
এ বার ভারতীয় বায়ুসেনা নয়, পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ভিতরে জমি এবং আকাশপথে অভিযান চালিয়েছে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী। একসঙ্গে নয়টি স্থানে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা হয় জঙ্গি পরিকাঠামো। হামলার সময়ে নয়াদিল্লি থেকে গোটা অভিযান নজরে রাখছিলেন মোদী নিজে। কিন্তু ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি দেশের সামনে ছিলেন একদম স্বাভাবিক, শান্ত এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যস্ত।
একটি ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে মঙ্গলবার রাতের অভিযানের প্রেক্ষাপট। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে সেই মঙ্গলবার থেকেই সারা দেশে যুদ্ধকালীন মহড়া—মক্ ড্রিল— শুরু হয়েছিল। মূলত বিমানহানা বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিস্থিতিতে নাগরিকদের কী করণীয়, তা শেখাতেই এই মহড়া। সাধারণ মানুষের কাছে তখনও পরিষ্কার ছিল না, ওই রাতেই ভারত চালাবে এক গুরুতর সামরিক প্রত্যাঘাত।
আবারও মঙ্গলবার, আবারও অপারেশন, আবারও মোদীর নিস্পৃহতা। দুই ঘটনা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই নীরবতা পরিকল্পনারই অংশ। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানের নাম না করেই বার্তা দেন, কিন্তু অপারেশনের আগাম কোনও পূর্বাভাস থাকেনা। এবং ঠিক তারপরেই ঘটে দৃঢ় প্রত্যাঘাত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা অভিযান যতটা না মাঠে বা মঞ্চে, তার চেয়ে বেশি হয় পরিকল্পনার স্তরে। এবং মোদীর এই বারবারের নিস্পৃহ প্রকাশ্য উপস্থিতি—কৌশলগত পরিকল্পনারই বহিঃপ্রকাশ। একমাত্র যখন সব শেষ হয়, তখনই সামনে আসে সেই এক কথায় ভারতীয় জবাব: ‘অপারেশন সিঁদুর’।