সিনেমার কল্পনা থেকে বৈজ্ঞানিক সত্য!
স্টিভেন স্পিলবার্গের তৈরি ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্য আজও অনেকের মনে টাটকা। পার্কের প্রতিষ্ঠাতা জন হ্যামন্ডের হাতে থাকা ছড়ির মাথায় বন্দি একটি মশার জীবাশ্ম— সিনেমার গল্পে দাবি করা হয়েছিল, সেই মশার পেটে থাকা রক্ত থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিল ডাইনোসরের ডিএনএ। সেই ডিএনএ ব্যবহার করেই নাকি ফিরিয়ে আনা হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক দানবদের। নব্বইয়ের দশকে এই ভাবনা নিছক কল্পবিজ্ঞান বলেই ধরা হত। কিন্তু তিন দশক পরে বিজ্ঞান বলছে, সিনেমার সেই ধারণার ভিতটা পুরোপুরি ভুল ছিল না।
সম্প্রতি আমেরিকার এক দল গবেষকের কাজ দেখিয়ে দিয়েছে, মশার শরীরে সত্যিই নানা প্রাণীর ডিএনএ পাওয়া যেতে পারে। ডাইনোসর নয় ঠিকই, তবে সমসাময়িক বহু প্রাণীর জিনগত তথ্য মশার শরীরে জমা থাকে। আর আশ্চর্যের বিষয়, এই গবেষণার অনুপ্রেরণাও এসেছে ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমা থেকেই।
এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন পতঙ্গবিদ লরেন্স রিভস। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, সিনেমাটি তাঁকে মশাদের দিকে নতুন চোখে তাকাতে শিখিয়েছে। রিভসের কথায়, “অনেকে বলেন, ‘জুরাসিক পার্ক’ জীবাশ্মবিদদের অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল মশা নিয়ে গবেষণা করতে।”
ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হল যে কোনও প্রাণীর জিনগত নকশা। শরীরের গঠন, বৈশিষ্ট্য, এমনকি বিবর্তনের ইতিহাস— সব কিছুর তথ্যই এতে লুকিয়ে থাকে। তাই যদি মশার শরীরে অন্য প্রাণীর ডিএনএ পাওয়া যায়, তা হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
এই ভাবনা থেকেই রিভস ও তাঁর সহকর্মী হান্না অ্যাটসমা গবেষণার জন্য বেছে নেন আমেরিকার মধ্য ফ্লরিডার প্রায় ১০,৯০০ হেক্টর বিস্তৃত একটি অঞ্চল। টানা আট মাস ধরে সেখানে মশা সংগ্রহ করা হয়। ২১টি ভিন্ন প্রজাতির ৫০ হাজারেরও বেশি মশা ধরা হয় গবেষণার সময়। এর মধ্যে থেকে আলাদা করা হয় কয়েক হাজার স্ত্রী মশা।
কারণ, পুরুষ মশা কখনও রক্ত খায় না। তারা ফুল বা গাছের রসেই বেঁচে থাকে। প্রজননের প্রয়োজনে শুধু স্ত্রী মশারাই অন্য প্রাণীর রক্ত শোষণ করে। তাই গবেষণার জন্য স্ত্রী মশাই ছিল মূল ভরসা। তাঁদের শরীরে থাকা রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা চমকে যান।
গবেষণায় দেখা যায়, স্ত্রী মশার শরীর থেকে মোট ৮৬টি ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর ডিএনএ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে— ছোট ব্যাঙ থেকে শুরু করে গরু পর্যন্ত। বিজ্ঞানীরা জানান, মশার নিজের রক্ত আলাদা, যাকে বলা হয় হিমোলিম্ফ, তা লাল নয়। মশার পেটে যে লাল রক্ত দেখা যায়, সেটি আসলে অন্য প্রাণীরই। আর সেই রক্তই হয়ে উঠেছে আধুনিক জীববৈচিত্র্যের এক চলমান ডিএনএ-আর্কাইভ।
ডাইনোসর ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন এখনও কল্পনাতেই রয়ে গেল। তবে ‘জুরাসিক পার্ক’-এর সেই সিনেমাটিক ধারণা যে বাস্তব বিজ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে, তা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।