সমুদ্রের বুকে জ্বলে থাকা আগুন!
২০০৩ সাল। গ্রিনল্যান্ড সংলগ্ন উত্তাল সমুদ্রে ঘটে যায় এক অভূতপূর্ব ঘটনা—প্রবল সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ। সেই উষ্ণতার ঢেউ শুধু বরফ গলিয়ে দেয়নি, বদলে দিয়েছিল গোটা বাস্তুতন্ত্রের ভাষা। দু’দশকেরও বেশি সময় কেটে গেলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই ‘আগুন’ এখনও নিভে যায়নি।
উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের সংযোগস্থলে তখন এক অদ্ভুত স্রোতের গোলকধাঁধা তৈরি হয়। সাধারণত ঠান্ডা মেরু স্রোত ওই অঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তার করে। কিন্তু সে বছর সেই স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ে। সুযোগ নিয়ে উষ্ণ ক্রান্তীয় স্রোত আটলান্টিক পেরিয়ে নরওয়ে সাগরে ঢুকে পড়ে। ঠান্ডা ও গরম—এই দুই বিপরীত স্রোতের সংঘাতে জন্ম নেয় ভয়াবহ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ।
এর প্রভাব ছিল অভূতপূর্ব। নরওয়ে সাগরের প্রায় ৭০০ মিটার গভীর পর্যন্ত জল উষ্ণ হয়ে যায়। সমুদ্রের বরফ দ্রুত গলতে শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এত গভীরে এমন তাপপ্রবাহ আগে কখনও দেখা যায়নি। শুধু উপরিভাগ নয়, সমুদ্রের অন্তঃস্তরও তখন ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে।
জার্মানি ও নরওয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের একটি দল গত একশোর বেশি গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছেন—২০০৩ সালের তাপপ্রবাহ ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সামুদ্রিক উষ্ণতার ঘটনা। দলের প্রধান কার্ল মাইকেল ওয়ের্নারের মতে, “ওই বছরের পর থেকেই সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা ক্রমশ বাড়ছে। যা একসময় ব্যতিক্রম ছিল, এখন তা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।”
এই তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সামুদ্রিক জীবজগতে। উত্তর আটলান্টিকের জলে এমন সব প্রজাতির মাছ ও তিমি দেখা যাচ্ছে, যাদের সেখানে আগে দেখা যেত না। বরফ গলার ফলে বেলিন প্রজাতির তিমিও ওই অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারছে। অন্য দিকে, ঠান্ডা জলের বাসিন্দা হুডেড সিল, নারওয়াল কিংবা আর্কটিক দাঁতযুক্ত তিমির সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
আটলান্টিক কড মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাপমাত্রা বাড়ায় তাদের স্বাভাবিক খাদ্য আর আগের মতো মিলছে না। তাই ঠান্ডা জলের সন্ধানে তারা আরও উত্তরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এক সময় সেই যাত্রারও শেষ সীমা থাকবে। তখন এই প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে বলেই আশঙ্কা।
পরিবর্তন শুধু প্রাণীতে নয়, সমুদ্রের নীচের উদ্ভিদজগতেও স্পষ্ট। শৈবাল ও সামুদ্রিক ঘাসের গঠন ও বিস্তার বদলে যাচ্ছে, যার প্রভাব পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলেছেন—এই তাপপ্রবাহ কোনও প্রাকৃতিক বিচ্যুতি নয়, এর পিছনে মানুষের ভূমিকা বড়। জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার ও গ্রিনহাউস গ্যাসের সঞ্চয়ে পৃথিবীর যে তাপ বেড়েছে, তার অধিকাংশই শুষে নিচ্ছে সমুদ্র। ফলে সমুদ্র ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, আর সেই উত্তাপই বদলে দিচ্ছে জীবনের মানচিত্র।
২০০৩ সালের সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ তাই শুধু একটি ঘটনা নয়, এক সতর্কবার্তা। সমুদ্রের বুকে জ্বলে থাকা সেই আগুন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির ক্ষত সারাতে সময় লাগে, কিন্তু মানুষের ভুল সারাতে চাই সচেতনতা। এখনই যদি থামা না যায়, ভবিষ্যতের সমুদ্র হয়তো আর আগের মতো থাকবে না।
‘স্পিরিট’-এ প্রভাসের ১৬০ কোটি! নায়িকাদের পারিশ্রমিকের ফারাক ঘিরে নতুন চর্চা