শোকের আচারই হয়ে উঠেছিল সর্বনাশ!
মানবসভ্যতা যতই আধুনিক হোক, পৃথিবীর কিছু প্রান্তে এখনও এমন বিশ্বাস ও প্রথা ছিল— যা আজ শুনলে গা শিউরে ওঠে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনির ফোর জনজাতির এমনই এক রীতি ছিল, যেখানে মৃত প্রিয়জনকে মাটিতে সমাধি দেওয়ার বদলে তাঁকে ভক্ষণ করাই ছিল শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পথ।
এই প্রথার নাম ছিল ‘এন্ডোক্যানিবালিজ়ম’— নিজের সম্প্রদায়ের মৃত সদস্যদের খাওয়া। ফোরদের বিশ্বাস ছিল, প্রিয় মানুষের দেহ পোকামাকড়ের খাদ্য হয়ে যাওয়ার চেয়ে পরিবারের সদস্যদের শরীরের অংশ হয়ে বেঁচে থাকাই অনেক বেশি সম্মানের। শোক, ভালবাসা আর স্মৃতিকে ধরে রাখার এই ভাবনা থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছিল এই আচার।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় পুরুষ, নারী ও শিশুরা— সকলেই অংশ নিতেন এই ভোজে। পুরুষেরা মৃতের মাংস খেতেন, আর মহিলা ও শিশুরা গ্রহণ করতেন সবচেয়ে ‘মূল্যবান’ অংশ— মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই অংশগুলির মধ্যেই থাকে মানুষের আত্মা ও শক্তি। মৃতের স্মৃতি যেন তাঁদের মধ্যেই বেঁচে থাকে— এমনটাই চাইতেন ফোররা।
মহিলারা অত্যন্ত যত্ন করে মস্তিষ্ক বের করে ফার্ন পাতার সঙ্গে মিশিয়ে বাঁশের নলের ভিতরে রান্না করতেন। শিশুরা মায়ের হাত থেকেই অল্প পরিমাণে এই খাবার পেত। বাইরে থেকে নিষ্ঠুর মনে হলেও, ফোরদের কাছে এটি ছিল করুণা আর শ্রদ্ধার প্রকাশ।
কিন্তু এই প্রথাই একসময় ডেকে আনে ভয়াবহ বিপর্যয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফোর জনজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক রহস্যময় রোগ— ‘কুরু’। স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ ‘কাঁপুনি’। আক্রান্তদের হাত-পা কাঁপত, চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে যেত, ধীরে ধীরে কথা বলা, খাওয়া— সবই অসম্ভব হয়ে পড়ত। অনেকের মধ্যে দেখা দিত অস্বাভাবিক হাসি। এক বছরের মধ্যেই মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠত।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা ও ছোট শিশুরা। কারণ তারাই মূলত মস্তিষ্ক ভক্ষণ করতেন। একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, বহু গ্রামে কার্যত কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নারীই অবশিষ্ট ছিলেন না। গোটা জনজাতি বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছিল।
প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি রোগের উৎস। স্থানীয়দের ধারণা ছিল, এটি আত্মা বা জাদুবিদ্যার প্রভাব। পরে গবেষকেরা আবিষ্কার করেন, কুরুর আসল কারণ ‘প্রিয়ন’ নামের এক ধরনের সংক্রামক প্রোটিন। এটি মস্তিষ্কে ঢুকে স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। এর কোনও চিকিৎসা নেই। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়— প্রিয়ন রান্নাতেও নষ্ট হয় না।
গবেষণায় স্পষ্ট হয়, সংক্রামিত মানুষের মস্তিষ্ক খাওয়ার মাধ্যমেই এই রোগ ছড়াচ্ছিল। অর্থাৎ, ভালবাসা থেকে জন্ম নেওয়া প্রথাই পরিণত হয়েছিল মৃত্যুফাঁদে।
১৯৫০ সালে প্রশাসনিকভাবে এই নরভক্ষণ প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। ধীরে ধীরে কুরুর প্রকোপ কমতে থাকে। যদিও প্রিয়নের দীর্ঘ সুপ্তাবস্থার কারণে বহু বছর পরেও কিছু মৃত্যু ঘটে। অস্ট্রেলিয়ার গবেষক মাইকেল আল্পার্সের মতে, কুরুতে আক্রান্ত শেষ ব্যক্তির মৃত্যু হয় ২০০৯ সালে। ২০১২ সালে এই মহামারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ বলে ঘোষণা করা হয়।
ফোর জনজাতির ইতিহাস আজ একটি কঠিন শিক্ষা— বিশ্বাস আর অন্ধ প্রথা, যদি প্রশ্নহীনভাবে চলতে থাকে, তবে তা গোটা একটি সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
প্রোটিন শেক নয়, ‘ঘরোয়া খিচুড়ি’ই ভরসা: শরীরচর্চার পরে হৃতিক রোশন যা খান, জানলে চমক লাগবেই