শুল্ক-কূটনীতির টানাপড়েন!
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চাপ বাড়ছে। সেই আবহেই এক মার্কিন সেনেটরের মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর দাবি, আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় কোয়াত্রা নাকি শুল্ক কমানোর বিষয়ে সরাসরি কথা বলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর সঙ্গে।
রবিবার ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এই দাবি করেন রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে হলে মস্কোর উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো জরুরি। সেই লক্ষ্যেই রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা দেশগুলির উপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানোর বিল নিয়ে আলোচনা চলছে। গ্রাহামের মতে, এমন কড়া শুল্ক আরোপ করা হলে রাশিয়ার তেল বিক্রি কমবে এবং তাতেই যুদ্ধ চালানোর অর্থনৈতিক ক্ষমতা দুর্বল হবে।
এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে ভারতের নাম। গ্রাহামের বক্তব্য, প্রায় এক মাস আগে ভারতের রাষ্ট্রদূতের বাড়িতে এক নৈশভোজে তাঁদের কথা হয়েছিল। সেই সময় কোয়াত্রা নাকি তাঁকে জানান, ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাচ্ছে। পাশাপাশি সেনেটরের কাছে জানতে চান, ভারতের উপর নির্ধারিত শুল্ক কমানোর বিষয়ে তিনি কি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলবেন? গ্রাহামের দাবি, ভারতের এই তেল আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত আসলে সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্কের আশঙ্কার ফল।
তবে এই মন্তব্য ঘিরে এখনও পর্যন্ত ভারতের তরফে কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে দিল্লি নীরব থাকলেও কূটনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে— আদৌ কি শুল্ক নিয়ে এমন কোনও অনুরোধ করা হয়েছিল, না কি এটি শুধুই একতরফা ব্যাখ্যা?
সংবাদসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, গত মাসেই ওয়াশিংটনে একাধিক মার্কিন সেনেটরকে আপ্যায়ন করেছিলেন বিনয় কোয়াত্রা। সেই বৈঠক নিয়ে সমাজমাধ্যমে রাষ্ট্রদূত নিজেই লেখেন, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক আরও মজবুত করার কথাও উঠে আসে। তবে সেখানে শুল্ক বা তেল আমদানি নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও অনুরোধের কথা প্রকাশ্যে বলা হয়নি।
ভারতের তেল আমদানির প্রেক্ষাপটটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে। ২০২১ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার অংশ ছিল খুবই সামান্য— মাত্র ০.২ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমি দেশগুলি মস্কোর তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায়। সেই সুযোগে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক কম দামে রাশিয়ার তেল পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে ভারত দ্রুত রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতায় পরিণত হয় এবং এক সময় বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাশিয়ান তেল আমদানিকারক দেশ হয়ে ওঠে।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সেই চিত্র বদলাচ্ছে। বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের দাবি অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের দৈনিক তেল আমদানি নেমে এসেছে প্রায় ১০ লক্ষ ২০ হাজার ব্যারেলে। আগের মাসে যা ছিল প্রায় ১৮ লক্ষ ৪০ হাজার ব্যারেল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর এই প্রথম এতটা কমেছে আমদানি।
এই পরিস্থিতিতে গ্রাহামের মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে— ভারতের তেলনীতি কি কেবল বাজারদরের হিসেবেই বদলাচ্ছে, না কি তার পিছনে রয়েছে শুল্ক ও কূটনৈতিক চাপের হিসাবও? উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। তবে আপাতত স্পষ্ট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ছায়া বিশ্ব বাণিজ্য আর কূটনীতির উপর ক্রমশ আরও গাঢ় হচ্ছে।