আদনান সামির গল্প এক প্রেম!
গায়ক আদনান সামি—সুরের জাদুকর, যাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ে আবেগ আর অভিজ্ঞতা। কিন্তু তাঁর জীবন শুধু গানেই সীমাবদ্ধ নয়, সেই জীবনে আছে সম্পর্কের টানাপড়েন, দুটি দেশের দ্বন্দ্ব, নিজের পরিচয়ের লড়াই, আর অসীম মানসিক দৃঢ়তার গল্প।
শুধু গায়ক হিসেবেই নয়, আদনান বারবার এসেছেন আলোচনায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ওজন হ্রাস, এবং ভারত-পাকিস্তান নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্কে। সম্প্রতি একটি টক শোয়ে তিনি নিজের জীবনের অজানা অনেক অধ্যায় তুলে ধরেন—যা শুনে অনেকের চোখে জল এসেছে।
২০১৫ সালে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়া আদনানের জন্ম লন্ডনে, ১৯৭১ সালের অগস্টে। পিতৃসূত্রে পাকিস্তানি হলেও, শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনেছিল ভারতে। ছোট থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর টান ছিল তাঁর। মাত্র ৫ বছর বয়সে পিয়ানো বাজানো শুরু, আর ৯ বছর বয়সেই প্রথম সুর রচনা। স্কুলের ছুটিতে বিদেশ থেকে ভারতে এসে পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার কাছে সন্তুর শেখা, আর আর.ডি. বর্মনের কনসার্টে আশা ভোঁসলের অনুপ্রেরণা পেয়েই স্থির করেন সঙ্গীতকেই বেছে নেবেন।
তবে জীবন সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত সম্পর্কও টালমাটাল। ১৯৯৩ সালে অভিনেত্রী জ়েবা বখতিয়ারকে বিয়ে করেন, কিন্তু তা টেকে মাত্র তিন বছর। এরপর আরও তিনবার বিয়ে করেন তিনি, কিন্তু প্রথম তিনটি সম্পর্কই ভেঙে যায়। অবশেষে ২০১০ সালে রোয়া সামিকে বিয়ে করে স্থিতি পান ব্যক্তিগত জীবনে। তাঁদের কন্যা মেডিনার জন্ম হয় ২০১৭ সালে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আসে ২০২4 সালের অক্টোবরে, যখন আদনানের মা পাকিস্তানে হঠাৎ প্রয়াত হন। মা–পুত্রের সম্পর্ক ছিল গভীর। মা’র শেষকৃত্যে যোগ দিতে পাকিস্তান সরকারের কাছে আবেদন করেন আদনান। ভারত সরকার পাশে দাঁড়ালেও পাকিস্তান তাঁকে ভিসা দেয়নি। শেষমেশ অনলাইনে ভিডিয়ো কলেই তাঁকে দেখতে হয়েছিল মায়ের শেষযাত্রা। সেই অভিজ্ঞতা আজও তাঁর কণ্ঠে বিষণ্ণতা আনে।
পাকিস্তান তাঁকে বহুবার তিরস্কার করেছে, সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে, এমনকি কেউ কেউ বলেছেন অর্থের লোভেই তিনি ভারতে এসেছেন। এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দিয়ে আদনান বলেন, “আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা সবসময় ভাল ছিল। আমি কোটি টাকার সম্পত্তি রেখে শিল্পীর স্বাধীনতা খুঁজে ভারতে এসেছি।”
আদনানের মতে, ভারতের শ্রোতাদের সঙ্গে তাঁর সংযোগ অনেক গভীর। বলিউডে ‘সাথিয়া’, ‘কোই মিল গয়া’, ‘পেজ থ্রি’, ‘ধামাল’-এর মতো বহু ছবিতে তাঁর গান শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। হিন্দি ছাড়াও তেলুগু, তামিল, কন্নড় ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।
তাঁর জীবনের আরেক অবাক করা অধ্যায় হলো শরীর পরিবর্তন। ২০০৬ সালে ওজন ছিল ২৩০ কেজি। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছিলেন, ছ’মাসের আয়ু। কিন্তু আদনান নিজের ইচ্ছাশক্তির জোরে ১৬৭ কেজি ওজন ঝরিয়ে ফিরে আসেন নতুন জীবন নিয়ে।
আজকের আদনান সামি শুধু একজন গায়ক নন—তিনি একজন সংগ্রামী, একজন নির্ভীক শিল্পী, যিনি নিজের পরিচয়ের জন্য, মায়ের শেষকৃত্যে যাওয়ার অধিকারের জন্য, এবং শিল্পের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। তাঁর জীবন যেন গান, যার প্রতিটি স্তবক জুড়ে আছে হার-জিত, প্রেম, প্রতিবাদ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
সারা দিন “স্নান করে বেরোলাম” লুক—কীভাবে পাবেন তরতাজা ও সতেজ চুলের জাদু?