মা, মাটি, মানুষ আর মাছ!
মাছে-ভাতে বাঙালিকে তার মাছ খাওয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া? দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের মাছবাজারকে ঘিরে সেই আশঙ্কাই এখন ঘোরাফেরা করছে বাঙালি মহলে।
দিল্লির মিনি কলকাতা বলে পরিচিত চিত্তরঞ্জন পার্কের ১ নম্বর মার্কেটের মাছের বাজার ঘিরে সম্প্রতি তৈরি হয়েছে বিতর্কের ঝড়। এই বাজারের পাশেই কালীমন্দির, আর সেটাকেই সামনে রেখেই বিজেপি ঘনিষ্ঠ এক সংগঠনের তরফে অভিযোগ—মন্দিরের পাশে মাছের বাজার, নাকি ধর্মের অপমান! এই দাবিকে কেন্দ্র করে উঠেছে বাজার তুলে দেওয়ার প্রশ্নও। আর তাতেই রেগে আগুন গোটা বাঙালি সমাজ।
তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র একটি ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আনতেই শুরু হয় বিতর্ক। সেখানে দেখা যায়, দু’জন যুবক নিজেদের ‘সনাতনী’ পরিচয় দিয়ে মাছবাজার নিয়ে আপত্তি তুলছেন। বলছেন, মন্দিরের পাশে আমিষ খাবারের গন্ধ আসা উচিত নয়। এমনকি তাঁরা ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন কেন আমিষ খাওয়া শাস্ত্রবিরোধী। দাবি তুলেছেন, বাজার সরিয়ে নিতে হবে।
এই ভিডিয়োর পিছনে ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ দেখছে বিজেপি। দলটির দাবি, তৃণমূল ইচ্ছাকৃত ভাবেই ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে যাতে চাকরি দুর্নীতি বা দলীয় অন্তর্কলহ থেকে নজর ঘোরানো যায়। বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খানের কথায়, “মহুয়া মৈত্র পরিকল্পিত ভাবেই ভিডিয়োটি পোস্ট করেছেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বাজার যেমন আছে তেমনই থাকবে।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি এত সহজে নিচ্ছেন না।
চিত্তরঞ্জন পার্কের প্রবীণ বাসিন্দা ইন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, “ইলিশ-চিংড়ির লড়াই দিয়ে যাঁদের সংস্কৃতি গাঁথা, তাঁদের পাত থেকে মাছ তুলে নেওয়ার হুমকি কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।”
বাজারের পুরনো ব্যবসায়ী দিব্যেন্দু দাস জানালেন, “ভিডিয়োটি আসলে ৩১ মার্চ তোলা, তখন নবরাত্রি চলছিল। সেই সময়েও ওই ছেলেরা এসেছিল। তবে তখন গা না করলেও, এখন বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে অশান্তি তৈরি করা হচ্ছে।”
অন্য ব্যবসায়ী সজল দাস বললেন, “তবে একটা ভালো দিক হয়েছে—এই ঘটনার পরে অনেকেই এসে আমাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন।”
এই ঘটনার সমালোচনায় মুখ খুলেছেন আপ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজও। তাঁর মতে, “নবরাত্রি চললেও বাঙালিরা আমিষ খান। ওটাই তাঁদের সংস্কৃতি। এখন সেই সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে বিজেপি।”
তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন এই ইস্যুতে রীতিমতো সোচ্চার। আজ তিনি মাছের ডিমের ফ্রায়েড রাইসের ছবি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন, লিখেছেন, “এটাই আমার মধ্যাহ্নভোজ। মাছের সঙ্গে কোনও সমঝোতা নয়।” পাশাপাশি তুলে ধরেছেন তৃণমূলের পুরনো স্লোগান — “মা, মাটি, মানুষ ও মাছ”।
বিজেপির অস্বস্তিও বাড়ছে।
রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরের নেতারা বুঝতে পারছেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের আগে বাঙালির আবেগে ধাক্কা খেলে তার মাশুল দিতে হতে পারে। তাই তড়িঘড়ি দিল্লি বিজেপির সভাপতি বীরেন্দ্র সচদেব বিবৃতি দিয়ে জানালেন, “মাছবাজারের ব্যবসায়ীরা সবসময় মন্দিরের পবিত্রতা বজায় রেখেই চলেছেন। ভিডিওটি আসলে শান্তি নষ্ট করার চক্রান্ত।”
দিল্লি পুলিশ ইতিমধ্যেই সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে—কে বা কারা ভিডিও বানিয়ে ছড়ালো, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।
বাঙালি বলছে, “মাছ শুধু খাবার নয়, আবেগও।” আর সেই আবেগে হস্তক্ষেপ মানে সরাসরি সংস্কৃতির উপর আঘাত। তাই লড়াইটা এখন শুধু বাজার রক্ষার নয়, এক চিরচেনা বাঙালিয়ানার অস্তিত্ব রক্ষারও।
তালা ভাঙার পাল্টা তালা! কসবা থেকে হুগলি—চাকরিহারাদের ক্ষোভে কাঁপছে রাজ্য