মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ-শূন্যতা
মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাটানো আমাদের প্রজনন ক্ষমতার উপর কী প্রভাব ফেলে? সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য বা ‘জিরো গ্র্যাভিটি’ অবস্থায় শুক্রাণু পথ হারাতে পারে এবং ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে অসুবিধা হয়। শুধু মানুষ নয়, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শুক্রাণুও একই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টি পরীক্ষা করেছেন। তারা ৩ডি ক্লিনোস্ট্যাট যন্ত্র ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য পরিবেশ তৈরি করেছেন। মানুষের পাশাপাশি শূকর এবং ইঁদুরের শুক্রাণু নিয়ে পরীক্ষার ফল দেখিয়েছে, এমন পরিবেশে শুক্রাণুর চলাচল প্রায় লক্ষ্যহীন হয়ে যায়। অর্থাৎ, শুক্রাণু প্রায় দিশাহারা হয়ে ঘুরছে—যেমন মানুষের মাথা ঘোরার সময় দিকপাল্টা হয়ে যায়।
গবেষকরা শুক্রাণুদের সামনে একটি চ্যানেল বা প্রণালী রেখেছিলেন, যা স্ত্রী জনননালীর মতো কাজ করে। মাধ্যাকর্ষণ থাকলে অধিকাংশ শুক্রাণু প্রণালী অতিক্রম করে ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছায়। কিন্তু শূন্য মাধ্যাকর্ষণে অনেক শুক্রাণু প্রণালীর মধ্যে ঠিকঠাক চলতে পারছে না। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকোল ম্যাকফারসন বলেন, “মাধ্যাকর্ষণ-শূন্যে খুব কম সংখ্যক শুক্রাণু উদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এখানে সমস্যা তাদের চলনের কারণে নয়, বরং মাধ্যাকর্ষণের অনুপস্থিতিই প্রভাব ফেলছে।”
২০২৪ সালের গবেষণাতেও দেখা গিয়েছিল, মাধ্যাকর্ষণ হঠাৎ পরিবর্তিত হলে শুক্রাণুর সক্রিয়তা কমে যায়। নতুন গবেষণায় এই বিষয় আরও পরিষ্কার হয়েছে—শূন্য মাধ্যাকর্ষণে শুক্রাণু জনননালী অতিক্রম করতে গিয়ে প্রাচীর স্পর্শ করতে পারছে না, ফলে তারা দিশাহারা হয়ে যায়। তবে কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, শুক্রাণু সবসময়ই উদ্দিষ্ট ডিম্বাণু খুঁজে পেতে সক্ষম হতে পারে, তবে সাফল্যের হার কমে যায়।
ম্যাকফারসনের দাবি, মাধ্যাকর্ষণ-শূন্যে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা অবস্থান করলেও প্রজনন সক্ষমতা কমতে পারে, আর দীর্ঘ সময় থাকলে এই প্রভাব আরও বাড়তে পারে। তিনি ও তার সহকর্মীরা মনে করেন, মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের সময় এই প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
এছাড়া, মহাকাশে প্রজনন বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। এটি শুধু মানবজাতির জন্য নয়, মহাকাশচারীদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত পরীক্ষা এবং মডেল তৈরি করা হবে, যা শূন্য মাধ্যাকর্ষণে শুক্রাণুর চলাচল ও জননক্ষমতার উপর প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে।
মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ-শূন্যতা শুধু মানবদেহের পেশি বা হাড়কে প্রভাবিত করে না, বরং আমাদের প্রজনন ক্ষমতার সুরক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।
শেষ লড়াইয়ের গল্প: জল থেকে তোলার পরও বেঁচে ছিলেন রাহুল, তবু বাঁচানো গেল না