পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায়ের খোলা মন
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে প্রথম বার ওরিজ়োন্তি বিভাগে সেরা পরিচালকের পুরস্কার উঠল এক ভারতীয়র হাতে। আর সেই কৃতিত্ব এনে দিয়েছেন পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায়। তাঁর ছবি সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ় শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল না, ভারতীয় সিনেমাকেও নতুন সম্মান এনে দিল। সাফল্যের আনন্দে ভাসলেও আক্রমণ, বিতর্ক এবং নানা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন তিনি।
হঠাৎ আলোয় উঠে আসা জীবন
পুরস্কার জয়ের পর থেকেই অনুপর্ণার চারপাশের পরিবেশ বদলে গিয়েছে। একদিকে ভালোবাসা, সম্মান, অপরিচিতদের শুভেচ্ছা, অন্যদিকে রাজনৈতিক রঙ চড়ানোর চেষ্টায় তিনি বিস্মিত। অনুপর্ণার স্পষ্ট কথা—তিনি কোনো দলের প্রতিনিধি নন, বরং নিজের জন্মভূমির প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস, “যে মুহূর্তে ভেনিসে ভারতের পতাকা উড়েছে, সেই মুহূর্তে আমি-ই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমী।”
স্বপ্নের মতো সেই ক্ষণ
পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্ত এখনও অনুপর্ণার কাছে অবিশ্বাস্য। তিনি জানান, মঞ্চে দাঁড়িয়ে এতটা নার্ভাস ছিলেন যে মনে হচ্ছিল, হয়তো লুটিয়ে পড়বেন। কাকে কাকে ধন্যবাদ জানাবেন, ভুল হয়ে যাবে না তো—এসব ভাবতেই কেটে গিয়েছে সেই সময়।
পরিবার ও পুরুলিয়ার আনন্দ
এই সাফল্যে সবচেয়ে খুশি তাঁর মা। আত্মীয়-স্বজন, পুরুলিয়ার মানুষরা তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। বহু বছর আগে পুরুলিয়া ছেড়ে দিল্লি-মুম্বইয়ে গিয়ে নতুন লড়াই শুরু করেছিলেন অনুপর্ণা। তবে প্রথম ছবিটাই বানিয়েছিলেন নিজের মাতৃভূমিতে। তাই এই সাফল্যে পুরুলিয়ার আনন্দও আলাদা।
ছবির পথে যাত্রা
ছোটবেলায়ই সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে পড়তে সিনেমার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। কাজ শিখতে, অভিজ্ঞতা পেতে চলে যান দিল্লি, তারপর মুম্বই। কলসেন্টারের চাকরি দিয়ে সংসার চালিয়েছেন, আবার একই সঙ্গে লিখেছেন, শুট করেছেন। নিজের ভাষা, নিজের মাটির গল্প নিয়েই প্রথম কাজ। পরবর্তীতে সেই ছবিই পৌঁছে যায় রাশিয়া, জার্মানি, নানা আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
পরিবারের ত্যাগ ও সমর্থন
২০১৫ সাল থেকে বাড়িছাড়া হলেও মা বরাবর পাশে থেকেছেন। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর যখন আর্থিক অসুবিধা তৈরি হয়, তখন বাবা হাত বাড়িয়ে দেন—বাড়িভাড়া থেকে খরচ, সবটুকু সামলে। বন্ধুবান্ধবও ছিলেন অবলম্বন। অনুপর্ণা মনে করেন, অচেনা শহরে সাহস নিয়ে টিকে থাকার এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে গড়ে তুলেছে।
বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ভালোবাসা
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের বহু তারকা তাঁর জয়ধ্বনি তুলেছেন। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় থেকে রাইমা সেন, প্রসেনজিৎ, জয়া আহসান—সকলের ভালোবাসা তাঁকে স্পর্শ করেছে। তাঁর মতে, বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই একজোট হয়ে কাজ করার চেষ্টা করেন, যা বিরল। এই সাফল্য তিনি কেবল নিজের নয়, গোটা ইন্ডাস্ট্রির জয় হিসেবেই মানেন।
বিতর্ক ও ব্যক্তিগত গল্প
কিছু মিলের অভিযোগ উঠলেও অনুপর্ণার দাবি, তাঁর ছবি একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফল। দিদা ও সৎকন্যার সম্পর্ক থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই তিনি এই কাহিনি লিখেছেন। জীবনের বাস্তব ঘটনাই তাঁর সৃষ্টির মূলভিত্তি।
শাড়ির আড়ালে পুরুলিয়ার ছাপ
ভেনিসের মঞ্চে তাঁর সাজও ছিল আলাদা। হালকা সুতি-সিল্কের মিশ্রণে তৈরি শাড়ি, যাতে আঁকা ছিল পুরুলিয়ার দেওয়ালচিত্র। বন্ধু মুস্কান মিত্তালের হাতে তৈরি সেই শাড়িই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিচয়ের বাহক।
আগামীর পরিকল্পনা
এখন অনুপর্ণার ইচ্ছা, কলকাতা ও পুরুলিয়াকে আরও ভালোভাবে চিনে সেখানেই কাজ করা। মাতৃভাষা, নিজের উপভাষাতেই তিনি সিনেমা বানাতে চান। এ বার দুর্গাপুজোয়ও দীর্ঘদিন পর কলকাতা-পুরুলিয়ার মেলবন্ধনে উৎসব কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
অনুপর্ণার কথায় স্পষ্ট—তিনি লড়াই করেন নিজের স্বপ্নের জন্য, দেশের গৌরবের জন্য। আর তাই ভেনিসের জয় কেবল ব্যক্তিগত নয়, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
ওড়িশায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে ইডির তল্লাশি, ১৩৯৬ কোটির প্রতারণা মামলায় উদ্ধার কোটি টাকার সম্পদ