তৃণমূলের ভাঙনের সুযোগে সিপিএম, কংগ্রেস না ঋতব্রত শিবির
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের পর রাজ্যের বিরোধী রাজনীতি এখন নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। ক্ষমতায় বিজেপির প্রত্যাবর্তনের পর যে বিরোধী পরিসর তৈরি হয়েছে, তা দখল করতে মরিয়া একাধিক রাজনৈতিক শক্তি। ভাঙনের মুখে পড়া তৃণমূল কংগ্রেস, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা সিপিএম, কংগ্রেস এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের নতুন শিবির— প্রত্যেকেই এখন নিজেদের অবস্থান মজবুত করার লড়াইয়ে নেমেছে।
প্রবীণ বাম নেতা সঞ্জয় পুততুন্ডের মতে, রাজ্যে দীর্ঘদিন পরে বামেদের সামনে নতুন সুযোগ এসেছে। দক্ষিণ কলকাতার নিজের বাড়িতে বসে তিনি বলেন, বহু বছর আগে জমি আন্দোলনের সময় যেমন সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, তেমনই এখন আবার মানুষের মধ্যে পৌঁছনোর সময় এসেছে। তাঁর বিশ্বাস, সিপিএম আবার ধীরে ধীরে সংগঠন পুনর্গঠন করতে পারছে, তবে তার আগে বিরোধী রাজনীতির মূল জায়গাটি নিজেদের দখলে আনতে হবে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের পর সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলটি এখন একাধিক ভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নতুন গোষ্ঠী, পাশাপাশি রয়েছে এনসিপিআই-সহ অন্য রাজনৈতিক মেরুকরণ। ফলে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রস্থল কার হাতে যাবে, তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
২১ জুলাইয়ের সমাবেশকে ঘিরে মমতা শিবিরের সামনে ছিল কঠিন পরীক্ষা। দলীয় নেতাদের বক্তব্য, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সমর্থকদের উপস্থিতি দেখিয়েছে যে মমতা এখনও মানুষের সঙ্গে আবেগের যোগাযোগ ধরে রাখতে সক্ষম। যদিও নেতৃত্বের একাংশ স্বীকার করছে, দলকে নতুন করে সংগঠিত করা এবং হারানো জমি ফিরে পাওয়া সহজ হবে না।
তৃণমূলের নেতাদের দাবি, অতীতেও কংগ্রেস দল ভেঙে নতুন নাম ও প্রতীক নিয়ে ফিরে এসেছিল। তাই দলীয় প্রতীক বা সাংগঠনিক পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের আস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের আশা, আগামী দিনে জেলা সফর এবং জনসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও রাজনৈতিক লড়াইয়ে গতি আনবেন।
অন্যদিকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের রাজনীতিতে যে “তৃণমূল বনাম বিজেপি” দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা এখন ভাঙতে শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য, বামেদের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক জোট নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিকল্প পরিসর তৈরি করা। সংগঠনের নিচুতলার কর্মীদের সক্রিয় করে নতুন করে মানুষের কাছে পৌঁছনোর ওপর জোর দিচ্ছে বাম নেতৃত্ব।
তবে সেলিম স্পষ্ট করেছেন, অতীতে তৃণমূলের সঙ্গে থেকে বামেদের ক্ষতি করেছেন— এমন কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বামফ্রন্টে জায়গা দেওয়া হবে না। তাঁর মতে, সংগঠন শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট রাখা জরুরি।
বিরোধী রাজনীতির আর একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হয়ে উঠতে চাইছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের নতুন গোষ্ঠী। দলের মুখপাত্র প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, সাংগঠনিক ও আইনি দিক থেকে তাঁদের অবস্থান যথেষ্ট শক্তিশালী। তাঁর মতে, মানুষ আর সংঘাত বা বিধানসভায় হট্টগোলের রাজনীতি চান না। উন্নয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গঠনমূলক বিরোধিতার মাধ্যমে তাঁরা বিকল্প রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আগামী দিনে সংখ্যালঘু ভোটও বিরোধী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। এতদিন এই ভোটব্যাঙ্ক মূলত তৃণমূলের পাশে থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তার একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক বিকল্পের খোঁজ করছে বলে মত অনেকের। কেউ কংগ্রেসের সম্ভাবনা দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন বামেদের প্রতিও নতুন আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আব্দুল মতিনের পর্যবেক্ষণ, পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থির হয়নি। তৃণমূলের প্রতি আস্থা কিছুটা কমলেও তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। একই সঙ্গে সিপিএম ও কংগ্রেস— উভয়ের কাছেই নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে কোন দল মানুষের ইস্যু নিয়ে সবচেয়ে কার্যকরভাবে রাস্তায় নামতে পারে, তার উপরই নির্ভর করবে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সিপিএমের পুনরুত্থানের চেষ্টা, কংগ্রেসের নতুন আশাবাদ এবং ঋতব্রত শিবিরের বিকল্প রাজনীতির দাবি— এই চারটি শক্তির লড়াই আগামী দিনে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।