বিদ্যাসাগরি চটি!
চটি—নিতান্তই সাধারণ, সাদাসিধে। বাহার নেই, ফ্যাশনের চাকচিক্য নেই। কালো চামড়ার পাতলা ফিতে পায়ে গলিয়ে নিলেই হল। গোড়ালি বা আঙুল আটকে রাখার কোনও বাড়তি বন্দোবস্তও নেই। কিন্তু এই সাধারণ চটিই এক সময় ইংরেজ শাসনের বুটজুতোর সামনে দাঁড়িয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে। এ ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রিয় চটি, যেটি আজও ‘বিদ্যাসাগরি চটি’ নামে পরিচিত।
এই চটির গল্প জড়িয়ে আছে প্রায় পৌনে দু’শো বছরের ইতিহাসে। কলকাতা তখন ভারতের রাজধানী। শহরের রাজপথে ইংরেজ সাহেবরা বুটজুতো পরে গটমটিয়ে হাঁটতেন। তারই জবাব এল দেশজ এক জোড়া চটির মধ্যে দিয়ে। কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলের চর্মশিল্পী ভবীচরণ দাস ও ক্ষেত্রমোহন দাসের তৈরি চটি পরে রাস্তায় নামতেন বিদ্যাসাগর। সহজ-সরল এই জুতোর মধ্যেই তিনি খুঁজে পেলেন আত্মমর্যাদার প্রকাশ।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার কথাই ধরা যাক। সালটা প্রায় ১৮৫০। বিদ্যাসাগর তখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক। একদিন গিয়েছিলেন হিন্দু কলেজে অধ্যক্ষ জেমস কারের সঙ্গে দেখা করতে। দেখা করতে গিয়ে অপমানজনক দৃশ্য দেখলেন— কার সাহেব বুটজুতো পরা পা টেবিলের ওপর তুলে রেখে আলাপ জমিয়েছেন। বিদ্যাসাগর রাগ পেলেও কিছু বললেন না। কিন্তু ভুললেনও না। কয়েক দিন পরে কার সাহেব যখন সংস্কৃত কলেজে এলেন, বিদ্যাসাগর তখন অধ্যক্ষ। সাহেবকে বসতে দিয়ে তিনি নিজের চটি পরা পা দুটো টেবিলে তুলে ধরলেন এবং চুপচাপ আলাপ চালালেন। যেন চুপ করেই জানিয়ে দিলেন— আত্মসম্মানের জবাবও দেওয়া যায়, তবে নিজের মতো করে।
এই সাধারণ চটিকে প্রথমে বলা হত ‘তালতলার চটি’। পরে বিদ্যাসাগরের নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে এর নাম হয় ‘বিদ্যাসাগরি চটি’। বিদ্যাসাগরের মতো এক নবজাগরণের নায়ক যখন এটিকে বেছে নিলেন, তখন সেটাই হয়ে উঠল বাঙালির প্রতিবাদের পরিচয়।
আজও এই চটির টান মুছে যায়নি। পুজোর বাজারে ফ্যাশনের ঝলমলে স্যান্ডেল বা হাওয়াই চপ্পলের ভিড়েও কেউ কেউ খুঁজে বেড়ান সেই বিদ্যাসাগরি চটি। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের ভিড়ে ঢুকে তার হদিস পাওয়া যায় ‘আদি কেএম দাস’ জুতোর দোকানে। স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, অন্ধকার সিঁড়ি, কিন্তু ইতিহাস যেন লুকিয়ে আছে সেখানেই। ব্যানারের তীরচিহ্ন মেনে গলির ভেতর ঢুকলেই মেলে সেই ঐতিহ্যের ঠিকানা।
চটির বাহ্যিক রূপ নিয়ে হাসাহাসি হতে পারে। কারও কাছে এটি নিছকই ‘বেসিক’। কিন্তু এই চটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিরাট প্রতীকী শক্তি। বুটজুতোর অহংকারের সামনে এক টুকরো দেশজ প্রতিরোধ। বিদ্যাসাগর প্রমাণ করেছিলেন— ফ্যাশনও হতে পারে নবজাগরণের বাহক, হতে পারে প্রতিবাদের অস্ত্র।
আজ প্রায় দুশো বছর পরও বিদ্যাসাগরি চটি শুধু এক ধরনের জুতো নয়। এটি বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক, স্বাধীন চিন্তার নিদর্শন। তাই আজও পুজোর কেনাকাটায় কেউ কেউ নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে মেলাতে খুঁজে ফেরেন এই সাদাসিধে অথচ তেজি জুতো। কারণ, পায়ে দিলে বোঝা যায়— এর ওজন শুধু চামড়া বা সুতোর নয়, ইতিহাস আর আত্মসম্মানেরও।