বাংলায় কার্তিক পুজোর জনপ্রিয়তা কম, দক্ষিণ ভারতে কেন এখনও প্রাসঙ্গিক?

কার্তিক পুজোর জনপ্রিয়তা কম আজ কার্তিক পুজো। বাংলায় এই দেবতার পুজো একসময় জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হলেও এখন তা ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে কার্তিক বা ষড়ানন আজও অন্যতম…

November 16, 2024
1 min read

কার্তিক পুজোর জনপ্রিয়তা কম

আজ কার্তিক পুজো। বাংলায় এই দেবতার পুজো একসময় জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হলেও এখন তা ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে কার্তিক বা ষড়ানন আজও অন্যতম জনপ্রিয় দেবতা। বাংলায় এই অবনমনের কারণ কী, এবং দক্ষিণ ভারতে তাঁর অবস্থান কেন এত দৃঢ়, তা নিয়ে বিশ্লেষণ প্রাসঙ্গিক।

কার্তিক দেবতা পুরাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ‘স্কন্দপুরাণ’-এর কাহিনিতে দেখা যায়, তারকাসুর নামক এক শক্তিশালী অসুরের অত্যাচারে দেবতারা শঙ্কিত হয়ে শিবের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলেন। শিবের মহাতেজ থেকে জন্ম নেন কার্তিক। কৃত্তিকা নামে ছয় জন নারী তাঁকে স্তন্যপান করান, যার ফলে কার্তিকের আরেক নাম হয়ে যায় ‘ষড়ানন’। তাঁর পরিচয় শুধু যুদ্ধের দেবতা বা দেবসেনাপতি নয়; কোথাও তিনি সন্তানলাভের প্রতীক, আবার কোথাও যৌনকর্মীদের আরাধ্য।

বাংলায় একসময় কার্তিক পুজো বেশ জনপ্রিয় ছিল। নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তানলাভের আশায় এই দেবতার আরাধনা করতেন। এই বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকের কৃপায় সন্তান লাভ সম্ভব, আর তিনি সেই সন্তানকে বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। আজও হুগলি, নদিয়া, বর্ধমান এবং উত্তর ২৪ পরগনার কিছু অঞ্চলে এই পুজো প্রচলিত। কিন্তু সারা বাংলার ক্ষেত্রে কার্তিক এখন শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের দেবতা হিসাবে সীমাবদ্ধ।

অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতে কার্তিক অত্যন্ত প্রভাবশালী। তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা এবং কেরালার মতো রাজ্যে কার্তিকের মন্দিরে ভক্তদের ভিড় লক্ষণীয়। সেখানে কার্তিক শুধুমাত্র যুদ্ধের দেবতা নয়, তিনি শৌর্যের প্রতীক। তামিল ভাষায় তাঁকে মুরুগান নামে ডাকা হয়, এবং তাঁকে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দক্ষিণ ভারতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে কার্তিকের স্থান এত দৃঢ় কেন, তা বোঝার জন্য ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়।

ঐতিহাসিক ও সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলায় ধর্মীয় পুজোর মাধ্যমে সামাজিক বিভাজন তৈরি হয়েছিল। দুর্গা, কালী, গণেশ, বিষ্ণুর মতো দেবতারা ‘এলিট’ হিসাবে স্বীকৃত ছিলেন। অন্যদিকে, কার্তিকের মতো দেবতারা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের উপাস্য হয়ে ওঠেন। যৌনকর্মীদের মধ্যেও কার্তিক জনপ্রিয় ছিলেন। বর্ধমানের কাটোয়া অঞ্চলে আজও কার্তিক পুজো জাঁকজমকের সঙ্গে হয়। যৌনকর্মীরা কার্তিকের পৌরুষে তাঁদের মানসিক আশ্রয় খুঁজে পেতেন।

বাংলার তুলনায় দক্ষিণ ভারতে কার্তিকের গ্রহণযোগ্যতা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণেই বেশি। তামিল সংস্কৃতিতে তিনি শক্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। তাছাড়া, দক্ষিণ ভারতে ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বাংলার তুলনায় অনেক বেশি সংরক্ষিত হয়েছে।

অতীতে কার্তিকের প্রতি বাংলার মানুষের যে আবেগ ও বিশ্বাস ছিল, তা আজ অনেকটাই কমে গিয়েছে। আধুনিক বাংলায় কার্তিক পুজো নিঃসন্তান দম্পতির ধর্মীয় আচার মাত্র। কিন্তু তাঁর পৌরাণিক পরিচয় এবং দক্ষিণ ভারতে তাঁর গুরুত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, এই দেবতা শুধুমাত্র সন্তানের কামনায় নয়, শক্তি, শৌর্য এবং সংস্কৃতির প্রতীক হিসাবেও চিরকাল প্রাসঙ্গিক।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *