পুকুরে কন্যাসন্তানকে ছুড়ে ফেলার অপরাধে বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

পুকুরে কন্যাসন্তানকে ছুড়ে ফেলার অপরাধে বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মুর্শিদাবাদের রানিতলায় পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার রায় দিল আদালত। কন্যাসন্তান জন্মের পর তার জীবনকে নিষ্ঠুরতার শিকার করা বাবার…

December 7, 2024
0 min read

পুকুরে কন্যাসন্তানকে ছুড়ে ফেলার অপরাধে বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

মুর্শিদাবাদের রানিতলায় পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার রায় দিল আদালত। কন্যাসন্তান জন্মের পর তার জীবনকে নিষ্ঠুরতার শিকার করা বাবার বিরুদ্ধে আদালত কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লালবাগের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারপতি ঋষি কুশারি অভিযুক্ত আলমামুন হককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পটভূমি

রানিতলার জীবনপুর দাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা মহিমা বিবি ২০১৯ সালের ২৫ নভেম্বর পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর স্বামী আলমামুন হক অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, কন্যাসন্তান জন্মালে তাকে হত্যা করবেন। মহিমার আশঙ্কা সত্যি হয়েছিল। তাঁদের কন্যাসন্তানের বয়স সাত মাস সাত দিন হওয়ার পর এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে।

মহিমার বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন আলমামুন হঠাৎই তাঁর কোল থেকে মেয়েকে ছিনিয়ে নেন এবং দৌড়ে পুকুরের দিকে চলে যান। মেয়েকে পুকুরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তিনি পালিয়ে যান। মহিমার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন এবং পুকুর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। তবে সেখানে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

অভিযুক্তের গ্রেফতার ও মামলার অগ্রগতি

মহিমার অভিযোগের ভিত্তিতে রানিতলা থানার পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আলমামুনকে গ্রেফতার করে। মামলার তদন্ত চলাকালীন পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত পূর্ব থেকেই কন্যাসন্তানের জন্ম নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি স্ত্রীকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভয় দেখাতেন।

এই ঘটনায় মোট ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। আদালতে তাদের বয়ান থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আলমামুন ইচ্ছাকৃতভাবেই শিশুটিকে হত্যা করেছেন। তদন্তে উঠে আসে, এই নির্মম ঘটনা ঘটানোর পেছনে মূল কারণ ছিল আলমামুনের পুত্রসন্তান না পাওয়ার প্রতি হতাশা।

আদালতের রায়

শনিবার লালবাগের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে মামলার চূড়ান্ত শুনানি হয়। বিচারপতি ঋষি কুশারি বলেন, “একজন বাবা হয়েও নিজের রক্তের সম্পর্ককে এভাবে ধ্বংস করা মেনে নেওয়া যায় না। এটি একটি নৃশংস অপরাধ।” আদালত অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

সমাজের প্রতিফলন

এই ঘটনা সমাজে নারীদের ও কন্যাসন্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতার একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। যদিও বর্তমান সময়ে সমাজের একাংশ কন্যাসন্তানের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে সচেতন, কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, এখনও কিছু মানুষ সেই পুরনো কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারেনি। পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা সমাজের এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পরিবারগুলোর মধ্যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে।

বিচার ব্যবস্থার প্রশংসা

বিচারব্যবস্থার দ্রুত পদক্ষেপ এবং অপরাধীর যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আদালত প্রশংসিত হচ্ছে। মহিমা বিবির মতো অনেক ভুক্তভোগী নারীর জন্য এটি একটি আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। আদালতের এই রায় সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রেরণ করেছে—কন্যাসন্তান কোনোভাবেই অপরাধের শিকার হতে পারে না, এবং যারা এই ধরনের অপরাধ করবে, তারা কঠোর শাস্তি পাবে।

সমাপ্তি

পাঁচ বছর আগের মর্মান্তিক এই ঘটনার অবসান ঘটলেও শিশুটির পরিবারের জন্য এটি এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে। তবে আদালতের রায় কন্যাসন্তানদের প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এই রায় সমাজকে আরও ন্যায়বিচার এবং সমতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *