এক সময়ের জাদুকরী রাস্তা আজ কোথায় হারিয়ে গেছে?
কলকাতার পার্ক স্ট্রিট একসময় শহরের অন্য কোনো অংশের সঙ্গে তুলনা করা যেত না। তা ছিল এক আলাদা, ঝকঝকে পৃথিবী। তবে সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র মনে করছেন, আজ সেই পার্ক স্ট্রিটকে আলাদা করে চেনা যায় না।
দেবজ্যোতির স্মৃতিতে পার্ক স্ট্রিট ছিল এক জীবন্ত কেন্দ্র। একসময় ওই এলাকার বিখ্যাত পানশালাগুলোতে নিয়মিত অনুষ্ঠান হতো। সেখানে বাজত আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি গান, গান করত দেশ-বিদেশের খ্যাতনীয় শিল্পীরা। “৬০-এর দশকে বহু খ্যাতনামী শিল্পী এখানে গান গেয়েছেন। সারা বিশ্বের ইংরেজি গানগুলোই এখানে বাজানো হতো। সেই স্মৃতিকে মাথায় রেখেই এই নতুন গান তৈরি করেছি,” বললেন দেবজ্যোতি।
সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে অনীক দত্ত পরিচালিত ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’–এর একটি গান। গানটিতে দেখা যায়, একসময় ব্যস্ত ও আলো-আঁধারির পার্ক স্ট্রিটের নাইটক্লাবের আবহ। দেবজ্যোতি জানান, এক সময় অমিতাভ বচ্চন, সত্যজিৎ রায়, রাহুল দেববর্মণও এখানে গান শুনতে আসতেন। তিনি নিজেও ৮০-এর দশকে দীর্ঘদিন ওই পানশালায় বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে অনুষ্ঠান করেছেন। “সেই সময় পার্ক স্ট্রিট এক অন্য রকমের জগত ছিল,” বললেন তিনি।
গানটি লিখেছেন অপরাজিতা বারুই, সুর ও সঙ্গীতায়োজন করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র, এবং গেয়েছেন তানিয়া সেন। দৃশ্যায়নে দেখা যায় রোজা পারমিতা দে ও ঋক চট্টোপাধ্যায়কে। দেবজ্যোতি আরও বলেন, “সেই সময়ের পানশালা এবং পার্ক স্ট্রিট শহরের মধ্যে এক অদ্ভুত গ্ল্যামার তৈরি করেছিল। গোটা শহর থেকে ওই এলাকা আলাদা ছিল। এখন হিন্দুস্থান পার্ক আর পার্ক স্ট্রিটের পার্থক্য বোঝা মুশকিল। আগে দরজার কাছে দাঁড়ালেই বোঝা যেত, কোন শিল্পী বা কোন ব্যান্ড অনুষ্ঠান করছে।”
দেবজ্যোতি মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসবেই। “সঙ্গীতেও বদল আসে, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবেই। তবে কিছু এখনও অপরিবর্তিত। যেমন, পার্ক স্ট্রিটের রেস্তরাঁর ওয়েটাররা আজও জানেন কোন অতিথি কোন খাবার পছন্দ করেন। তারা আজও আগের মতোই রয়েছে।”
অনীক দত্ত ছবিতে দুই সময়কালের কলকাতার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। বর্তমান কলকাতার রূপ নিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। দেবজ্যোতি বলেন, “সময় পরিবর্তন নিয়ে আসে, তবে স্মৃতিগুলো চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকে। পার্ক স্ট্রিটের সেই জাদুকরী মুহূর্তগুলো, শিল্পীর সুর, বাতাসের মেলোডি—সবই আজও হৃদয়ে বেঁচে আছে।”
একসময় যেখানে সঙ্গীত আর আলো-আঁধারির ছোঁয়া ছিল, আজ সেখানে সেই প্রাণশক্তির কিছুটা অস্তিত্ব থাকলেও, শহরের আধুনিক রূপের সঙ্গে মিশে গেছে। দেবজ্যোতি মনে করিয়ে দেন, পার্ক স্ট্রিটের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে চেনার জন্য শুধু চোখ নয়, হৃদয়কেও খুলে দিতে হবে।