মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক নির্দেশে উত্তেজনা ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে। পানামা খালে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য পেন্টাগনকে নির্দেশ পাঠিয়েছে হোয়াইট হাউস। একইসঙ্গে, পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য সব ধরনের ‘সামরিক বিকল্প’ খতিয়ে দেখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পানামা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের অভিযোগ ও পানামার অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প অভিযোগ তুলেছেন যে, পানামা খাল দিয়ে যাওয়া মার্কিন জাহাজগুলোর ওপর অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, চীনের প্রভাব বাড়ানোর একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই শুল্ক বসানো হয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে তিনি বলপ্রয়োগেও পিছপা হবেন না।
পানামা সরকার, যদিও, ট্রাম্পের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, পানামা খালের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস হবে না এবং তারা তাদের ভূখণ্ডের সুরক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেবে।
পানামা খালের কৌশলগত গুরুত্ব
পানামা খাল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ। এটি প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরকে সংযুক্ত করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০ শতকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রই এই খাল খনন করেছিল এবং দীর্ঘদিন এর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই ছিল। পরে, ১৯৭৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের শাসনামলে একটি চুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় যে, ১৯৯৯ সালে পানামা সরকারকে খালটির নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেই চুক্তির ভিত্তিতেই বর্তমানে পানামা সরকার খালের একক মালিকানা ভোগ করছে।
পানামার প্রতিক্রিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক
পানামার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হ্যাভিয়ের মার্টিনেজ আচা বলেছেন, ‘‘শুধুমাত্র পানামার জনগণের হাতেই এই খালের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’’ ওয়াশিংটনের সামরিক চাপের মুখেও পানামা নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করবে না বলে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এরই মধ্যে আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের একাংশ দাবি করছে, পানামা সরকার চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পে যুক্ত থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সেটি থেকে বেরিয়ে গেলেও, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পানামা এখনও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-পানামা সংঘাতের আশঙ্কা
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে অনেকেই পানামা খালের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন। যদি পানামা মার্কিন শর্ত মেনে না নেয়, তবে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে, পানামা সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব রাজনীতির পরবর্তী ধাপ কী হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পানামা কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটবে, নাকি নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আরও কঠোর অবস্থান নেবে? ট্রাম্প প্রশাসন কি সত্যিই সামরিক পদক্ষেপের পথে যাবে, নাকি এই পদক্ষেপ শুধু পানামার ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল? এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সমাধান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।