শপিং মলে উঠে এল মনোরোগীদের না বলা গল্প!
একটি ব্যস্ত শপিং মল। চারপাশে মানুষের ঢল। কেউ খাবারের দোকানে, কেউ বা পছন্দের ব্র্যান্ডের পোশাক কিনতে ব্যস্ত। এমন এক পরিবেশে হঠাৎ চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য—একটি গাছ সাজানো হয়েছে মানুষের না বলা মনের কথায়। এই গাছ কিন্তু সাধারণ নয়, এটি ‘ম্যাড স্টোরিজ’ বা ‘পাগলের গল্প’।
এই বিশেষ শিল্পকর্ম তুলে ধরেছে মনোরোগীদের অনুভূতি, একাকিত্ব, আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার গল্প। সাধারণত, সমাজ যাঁদের ‘পাগল’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে, তাঁদেরই কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়েছে এই শিল্পে।
কে পাগল? কিসের প্রলাপ?
আমাদের সমাজে “পাগল” শব্দটি প্রায়শই ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যবহৃত হয়। মনোরোগীদের কথা সাধারণত “প্রলাপ” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যদি কেউ লেখেন, “আমার মায়ের কথা মনে পড়ে, তবু কেউ বাড়িতে ডাকে না”, তাহলে কি সেটাও শুধুই প্রলাপ? নাকি তা এক গভীর মানসিক যন্ত্রণা ও একাকিত্বের বহিঃপ্রকাশ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দক্ষিণ কলকাতার এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এক অভিনব প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছে। শিল্পী সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায় (সানি) ও অনিতেশ চক্রবর্তী মনোরোগীদের লেখা এক লাইনের ছোট ছোট গল্প সংগ্রহ করে তৈরি করেছেন একটি অনন্য ইনস্টলেশন।
এই ইনস্টলেশনটি সাজানো হয়েছে নানা উপাদানে—কাগজ, পুরোনো পোশাক, জিন্স, কাপড়, এবং অন্যান্য উপকরণে লেখা মনোরোগীদের নিজেদের কথা। প্রতিটি গল্পই একেকটি বাস্তব অভিজ্ঞতা।
সমাজের চোখে ‘সুস্থ’ বনাম ‘অসুস্থ’
শপিং মল সাধারণত সমাজের তথাকথিত “সুস্থ” মানুষদের জন্যই নির্ধারিত স্থান। সেখানে থাকা মানুষেরা হয়তো ভাবেন, “মনোরোগীরা এখানে কেন?” অথচ এই প্রদর্শনী সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে—মনোরোগীদের অনুভূতি কি আমাদের চেয়ে এতটাই আলাদা?
এই শিল্পকর্মটি যেন সমাজের চোখে আয়না ধরেছে। সাধারণত, “পাগল” বলে যাঁদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাঁদেরও তো আবেগ আছে, প্রেম আছে, পরিবারের জন্য আকুলতা আছে। তবুও সমাজ তাঁদেরকে মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।
একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার গল্প
এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে মনোরোগীদের একাকিত্বের বেদনাদায়ক গল্প। যেমন—
🔹 এক মা লিখেছেন, “আমার সন্তানকে দেখতে চাই, কিন্তু কেউ আমাকে দেখতে দেয় না।”
🔹 একজন লিখেছেন, “আমাকে নিয়ে কারও কোনো চিন্তা নেই, আমিও বোধহয় নেই।”
🔹 আরেকজনের কথা, “আমি হাসতে চাই, কিন্তু চারপাশের মানুষ আমায় ভয় পায়।”
প্রত্যেকটি লাইনই একেকটি না বলা যন্ত্রণার গল্প।
সমাজের বাধা ভাঙতে ‘ম্যাড স্টোরিজ’
এই প্রদর্শনীর অন্যতম লক্ষ্য হলো মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মনো-সমাজকর্মী রত্নাবলী রায় বলেন,
“আমাদের সমাজে যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাঁরা সংখ্যালঘুদের বুঝতে চান না। মনোরোগীদের ক্ষেত্রেও তাই হয়। তাঁদের অনুভূতি, কষ্ট সবই ‘অসুস্থতার লক্ষণ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা যে আসলে আমাদেরই মতো মানুষ, সেটাই বোঝানো দরকার।”
এই প্রদর্শনী যেন সেই দেয়াল ভাঙারই একটি প্রয়াস।
কেন শপিং মলকে বেছে নেওয়া হলো?
মনোরোগীদের কথা সাধারণত হাসপাতালের চার দেয়ালে আটকে থাকে। কিন্তু এই প্রদর্শনীটিকে শপিং মলে এনে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে—যেন সমাজ তাঁদের কথা শোনে, বোঝে, আর নতুন করে ভাবে।
প্রদর্শনী চলবে আর কদিন!
দক্ষিণ কলকাতার সাউথ সিটি মলে এই বিশেষ প্রদর্শনী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। মলের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকলেই দেখা যাবে এই অচেনা, কিন্তু হৃদয়স্পর্শী শিল্পকর্ম।
সমাজের চোখে ‘পাগল’ বলে যাঁদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়, তাঁরা কিন্তু আমাদের মতোই মানুষ। তাদের গল্প শোনার সময় কি এখনো আসেনি?
ট্রাম্পের ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণার অপেক্ষায় বিশ্ব, ভারতের চিন্তা বাড়ছে!