জাফর এক্সপ্রেস অপহরণকাণ্ডে ধোঁয়াশা: কী ঘটেছিল সত্যিই?
বালোচিস্তানের জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাই নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্য নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। ‘বালোচ লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ) অভিযোগ তুলেছে যে, ইসলামাবাদ জনগণকে বিভ্রান্ত করতে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে।
গত ১১ মার্চ কোয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাই করে বালোচ বিদ্রোহীরা। সেনাবাহিনী সঙ্গে সঙ্গেই অভিযানে নামে। সেনার বিশেষ বাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কর্পস, বায়ুসেনা এবং আধা-সামরিক বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। পাহাড়ি অঞ্চলে ঘিরে ফেলা হয় ট্রেনটি। কিন্তু ঘটনার পর সেনার দেওয়া তথ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
পাক সেনার দাবি বনাম বিদ্রোহীদের বক্তব্য ১২ মার্চ সেনাবাহিনী জানায়, তারা ৩০০ পণবন্দিকে উদ্ধার করেছে এবং ৩৩ জন বিদ্রোহীকে হত্যা করেছে। কিন্তু বিএলএ একেবারে উল্টো কথা বলছে। তাদের দাবি, অপারেশন এখনও শেষ হয়নি এবং বেশ কয়েকজন পণবন্দি এখনো তাদের দখলে।
বিএলএ মুখপাত্র জিয়ান্দ বালোচ বলেন, “আমরা বেশ কিছু সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিয়েছি, কিন্তু সেনাবাহিনী সেই সংখ্যাকেও নিজেদের ‘উদ্ধার’ হিসেবে প্রচার করছে। পাক সেনা মিথ্যা প্রচার চালিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে চাইছে।”
মৃতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা মাত্র একজন সৈনিক হারিয়েছে এবং বিদ্রোহীদের হাতে ২৭ জন সেনা কর্মী নিহত হয়েছে। অর্থাৎ মোট ৬১ জন নিহত। কিন্তু বিদ্রোহীরা বলছে, কমপক্ষে ৮৩ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৫০ জন পণবন্দি। এমনকি বালোচিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আখতার মেঙ্গলও বলেছেন, আসলে শতাধিক সেনা নিহত হয়েছে।
রয়টার্সের প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, পাকিস্তানের কোয়েটা রেল স্টেশনে কয়েক ডজন কফিন রাখা হয়েছে। অথচ সেনা দাবি করেছে, নিহতের সংখ্যা মাত্র ৬১! তাহলে ১৫০-২০০ কফিন কেন পাঠানো হলো? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি।
সেনাবাহিনীর দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনী প্রথমে আফগানিস্তানকে দোষারোপ করতে শুরু করে। তারা দাবি করে, তালিবান সরকারের মদতে বিদ্রোহীরা এই অপহরণকাণ্ড চালিয়েছে। কিন্তু কাবুলের সরকার এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে এবং পাল্টা বলেছে, “ইসলামাবাদ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
এরপর ভারতকে জড়ানোর চেষ্টা করে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ দাবি তোলে, ভারতই এই হামলার ষড়যন্ত্র করেছে। তবে আন্তর্জাতিক মহল এই অভিযোগ হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কটাক্ষ করে জানায়, “পাকিস্তান নিজেই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের উৎস।”
সেনাবাহিনীর অতীত রেকর্ড কি বলে? পাক সেনাবাহিনীর সত্য গোপনের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধে নিহত পাক সেনাদের দেহ নেওয়ারও অস্বীকার করেছিল ইসলামাবাদ। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাই তাদের সমাহিত করেছিল। এবারও জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাইয়ের ঘটনায় সেনাবাহিনী তাদের অপারেশনকে ‘সফল’ দেখাতে মৃতদেহ লুকানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শেষ কথা জাফর এক্সপ্রেস অপহরণকাণ্ড নিয়ে প্রকৃত সত্য কী, তা পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনী ছাড়া কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না। তবে যেভাবে তথ্যের গরমিল দেখা যাচ্ছে, তাতে এটাই স্পষ্ট—সত্যের চেয়ে মিথ্যাকে ঢাকতেই ব্যস্ত ইসলামাবাদ।